ঈদের বেচাকেনায় গতি নেই, হতাশ ব্যবসায়ীরা

করোনা মহামারির জন্য এবারের ঈদকে সামনে রেখেও কাঙ্ক্ষিত ব্যবসা হচ্ছে না ব্যবসায়ীদের। এনিয়ে তিনটি ঈদই তাদের ব্যবসা না করেই কাটাতে হচ্ছে। শুধু ঈদ কেন গত বছর থেকে কোনো উৎসবেই ব্যবসা করতে পারেননি তারা। গত বছরের দুটি ঈদেই করোনার সংক্রমণ ছিল, এবারও বিধিনিষেধের মধ্যেই কাটছে ঈদ মওসুম। এছাড়া গত বছরসহ দুটি পহেলা বৈশাখ, দুটি ফাগুন, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসেও মানুষ যে আনন্দ উদ্দীপনায় দিবসগুলো উদ্যাপন করে তা করা সম্ভব হয়নি। করোনা মহামারির সংক্রমণ রোধে যেহেতু উৎসবগুলো পালন করা যাচ্ছে না তাই ব্যবসাও একেবারেই বন্ধ ব্যবসায়ীদের।

গতবছর ঈদ, পহেলা বৈশাখের ব্যবসা না হওয়ায় এবছর ঈদকে সামনে রেখে পুরোদমে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু হঠাৎ মহামারির সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সেই ব্যবসাও মার খেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারি বিধিনিষেধের মধ্যে গত ২৫ এপ্রিল থেকে দোকানপাট খোলা থাকলেও ঈদকেন্দ্রিক বেচাবিক্রিতে কোনো গতি নেই। লকডাউন শিথিল করায় বিক্রির আশায় দোকান খুললেও রাজধানীর মার্কেটগুলো ক্রেতাশূন্য। বেশিরভাগ পোশাকের দোকানেই বিক্রি একেবারেই নেই। ফলে ব্যবসায়ীরা প্রচণ্ড হতাশ। ঈদের আগে যে রকম ক্রেতা সমাগম মার্কেটে দেখা যায়, তার ছিটেফোঁটাও নেই।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রথমত, দীর্ঘসময় মহামারির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে এসেছে। এর পাশাপাশি গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সারা দেশের ব্যবসায়ীরা ঢাকায় পণ্য কিনতে আসতে পারছেন না। আবার দেশের নানা প্রান্ত থেকে যারা রাজধানীতে কেনাকাটা করতে আসেন তারাও আসতে পারছেন না। যে কারণে বিক্রি একেবারেই নেই।

এদিকে পরপর দুই বছর ব্যবসা না করতে পারলে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাবেন বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করে সরকারের আর্থিক সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন, যাতে অন্তত হারানো পুঁজি পেয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর রসদ পায়। না হলে অনেকেই পেশা থেকে হারিয়ে যাবেন।

যদিও লকডাউন শিথিলের সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামের হাট ও মফস্বলের ঈদ বাজার বড় শহরের তুলনায় কিছুটা চাঙ্গা। ধানের আবাদ ঘরে তুলতে পারায় গ্রামাঞ্চলে কৃষকের হাতে টাকা এসেছে। সে কারণেই গঞ্জের হাট, মফস্বলের ঈদ বাজার জমে উঠেছে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্টে মফস্বলের ঈদ বাজারে সামাজিক দূরত্ব না মেনে এবং স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে ঈদ বাজারে মানুষের ভিড়ের চিত্র উঠে এসেছে।

রাজধানীর পান্থপথে বসুন্ধরা শপিংমলে গতকাল দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ বিক্রয়কেন্দ্রই ছিল ক্রেতাশূন্য। ঈদ পোশাকের বড় আয়োজন থাকে দেশী দশে। সেখানেও ক্রেতা পাওয়া গেল হাতে গোনা কয়েক জন।

ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটের ফুজি শাড়ি ফ্যাশনের প্রোপ্রাইটর নাছির আহমেদ জানান, বিক্রি খুব কম। লাভ ছাড়া একেবারে গায়ের দামে শাড়ি বিক্রি করছি। যাতে দৈনন্দিন খরচ চালাতে পারি। এভাবে ব্যবসা টেকানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

নিউ চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের শামীম ক্লথ স্টোরের প্রোপ্রাইটর মো. বজলুল করিম বললেন, সারা দিনে দশটা শাড়িও বিক্রি হচ্ছে না। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ক্রেতা আসতে পারছেন না। বিশেষ করে পাইকারি ক্রেতারা আসছেন না বলে আমাদের বিক্রির অবস্থা খুব ভালো না।

তবে রাজধানীর শপিংমলগুলোতে বিক্রি না থাকলেও শহরতলীর মার্কেটে টুকটাক বিক্রি হচ্ছে। কেরানীগঞ্জের কদমতলী মোড় কিংবা আটি বাজারের মার্কেটগুলোতে টুকটাক ঈদের বিক্রি শুরু হয়েছে বলে জানালেন বিক্রেতারা। আটি বাজারের বাছারী মার্কেটের কলমারচর বস্ত্র বিতানের প্রোপ্রাইটর মো. আকতার হোসেন বললেন, স্বাভাবিক সময়ে যেমনটা হতো তেমন বিক্রিও হচ্ছে না। চাকরিজীবীরা কম আসছেন কোনাকাটা করতে। নতুন ধান উঠায় কৃষকরাই এখন মূল ক্রেতা ঈদ বাজারের।

ঢাকা কলেজের উলটো পাশের জাহান ম্যানশনের পাঞ্জাবির দোকান আব্দুল্লাহ পাঞ্জাবির কর্নধার মোহাম্মদ আশরাফুল বললেন, আমি কারখানা বন্ধ করে বসে আছি। গত বছর ঈদের জন্য যে পাঞ্জাবি বানিয়েছি সেসবও এখনো বিক্রি হয়নি। গতবার জমি বিক্রি করে কাপড়ের দাম আর কারিগরের খরচ দিয়েছি। এবার সেটাও করতে পারছি না।

এদিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি পাঞ্জাবির বাজার সদরঘাটের আট তলা শরীফ মার্কেট। সেখানকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানালেন, গত বছরের ব্যবসার ক্ষত মেটাতে ধারদেনা করে আবার ব্যবসা গুছিয়ে আনার চেষ্টায় ছিলেন তারা। ঈদের আগে প্রত্যেক দোকানি পাঞ্জাবি তুলে কেবল বিক্রি শুরু করেছিলেন, তখনই নতুন করে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। ফলে ব্যবসা আবার বন্ধ।