উচ্চমূল্যের পোশাকের বাজার পাচ্ছে না বাংলাদেশ

বাংলাদেশের দাপট এখনও শুধু কম দামের পোশাক রফতানিতেই। যদিও এ খাতের উদ্যোক্তারাই বলছেন, করোনার সময়টুকু বাদ দিলে তৈরি পোশাকের বাজার এখন উচ্চমূল্যের দিকে। অথচ দশমিক ১ শতাংশ আয় আসে উচ্চমূল্যের পোশাক রফতানি থেকে, বলা যায় আসেই না। 

২০১৮ সালে হালনাগাদ করা বিজিএমইএর তথ্যে দেখা যায়, কম দামের পোশাক রফতানিতে পারদর্শী বাংলাদেশ। ৩৫ ডলারের বেশি দামের পোশাকের রফতানির বাজারের বাইরেই এখনও ঘোরাঘুরি করছে কয়েক দশকের বেশি সময়ের পরিপক্ব এই খাতটি। এমন দামের পোশাক রফতানি থেকে বাংলাদেশের আয় দশমিক ১ শতাংশ। আর এ খাতের আয়ে ৬ শতাংশেরও (৫.৯৩) কম জোগান দেয় ২০ থেকে ৩৫ ডলারের পোশাক। প্রায় ১৪ শতাংশ (১৩.৮০) আসে যেসব পোশাকের দাম ১৫ থেকে ২০ ডলারের মধ্যে। অথচ ১৫ ডলারের কম দামের পোশাক রফতানি করেই আসে এ খাতের ৮০ ভাগের (৮০.১৬) বেশি রফতানি আয়। 

উদ্যোক্তারা বলছেন, উচ্চমূল্যের দিকেই যাচ্ছে তৈরি পোশাকের বাজার। শ্রমিকদের অদক্ষতার কারণেই বাজার ধরতে পারছেন না বলে জানান নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরির জন্য যে ধরনেরে কাঁচামাল দরকার দেশে তা পাওয়া যায়। বিদেশ থেকে সেসব কাঁচামাল আমদানি করা হলেও এসব পোশাক তৈরির জন্য যে ধরনের দক্ষ শ্রমিক দরকার তার অভাব রয়েছে। তাই উদ্যোক্তারা চেষ্টা করলেও এই বাজার ধরতে পারছে না।  

তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, নারীদের কটন ব্লাউজ, স্কার্টস- বিশ্বব্যাপী এ ধরনের পোশাকের চাহিদা রয়েছে ৪৭৬ দশমিক ৫ কোটি ডলারের। সেখানে বাংলাদেশ সরবরাহ করে মাত্র ২৭ দশমিক ৫ কোটি ডলারের পোশাক। শতাংশের হিসাবে তা মাত্র ৫ দশমিক ৭৮ ভাগ। নারীদের কটন, নিটেড বা কুশিকাটা ব্লাউজের বিশ্ববাজার ১৯৬ দশমিক ৮ কোটি ডলারের। বাংলাদেশের জোগান দেয় মাত্র ১৪ দশমিক ৮ কোটি ডলারের পোশাক। শতভাগ চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশের অংশ মাত্র সাড়ে ৭ ভাগ। নারীদের কটন, নিটেড বা কুশিকাটা নাইটির ১৭৬ কোটি ডলারের বিশ্ববাজারে মাত্র ৯ দশমিক ৭৬ ভাগ জোগান দেয় বাংলাদেশ; টাকার অঙ্কে যা ১৭.২ কোটি ডলার। নারীদের কটন স্কার্টস- বাংলাদেশ এ ধরনের পোশাক সরবরাহ করে কোটি ১৬ দশমিক ৩ ডলারের। অথচ এ ধরনের পোশাকের বিশ্ববাজার ১৬৩ দশমিক ৬ কোটি ডলারের। বাংলাদেশে অংশ ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। নারীদের কটন, নিটেড ড্রেসের ২৬৬ দশমিক ৮ কোটি ডলারের বাজারে বাংলাদেশ সরবরাহ করে ২৬ দশমিক ৮ কোটি ডলারের পোশাক। অর্থাৎ মোট চাহিদার ১০ দশমিক ০৫ ভাগ। নারীদের কটন ড্রেসের ৩৩৪ দশমিক ৮ কোটি ডলারের বাজারে বাংলাদেশ সরবরাহ করে ২২ দশমিক ২ কোটি ডলারের পোশাক অর্থাৎ মোট চাহিদার ৬ দশমিক ৬৪ ভাগ। নারীদের গার্মেন্টস- ফেব্রিক ৫৯ দশমিক ০৩, ৫৯ দশমিক ০৬ অথবা ৫৯ দশমিক ০৭ দিয়ে তৈরি করা পোশাকের ৩০৯ দশমিক ৭ কোটি ডলারের বাজারে বাংলাদেশের যোগান ১৬ দশমিক ৯ কোটি ডলারের পোশাক। চাহিদা মাত্র ৫ দশমিক ৪৫ ভাগ। কটন, নিটেড বা কুশিকাটা গার্মেন্টসের ২৩৮ দশমিক ৯ কোটি ডলারের বাজার চাহিদার মাত্র ৫ দশমিক ৫ কোটি ডলারের পোশাক সরবরাহ করে বাংলাদেশ। চাহিদা মাত্র ২ দশমিক ২৯ শতাংশ। পুরুষদের কটন এনোরাক্স, উইন্ড চিটারের ১৬৫ দশমিক ২ কোটি ডলারের বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের সরবরাহ ২০ দশমিক ৩ কোটি ডলারের পোশাক। চাহিদার ১২ দশমিক ২৯ ভাগ। নারীদের কটন এনোরাক্স, উইন্ড চিটারের ১৫৬ দশমিক ৭ কোটি ডলারের বিশ্ববাজারে ১৮ দশমিক ৬ কোটি ডলারের পোশাক সরবরাহ করে বাংলাদেশ। চাহিদার ১১ দশমিক ৮৫ ভাগ। পুরুষদের কটন জ্যাকেট এবং ব্লেজারের বিশ্ববাজার যেখানে ১১৪ দশমিক ৫ কোটি ডলারের সেখানে বাংলাদেশ সরবরাহ করে মাত্র ১১ দশমিক ৫ কোটি ডলারের পোশাক। চাহিদার ১০ দশমিক ০৯ ভাগ। নারীদের কটন, নিটেড বা কুশিকাটা কোটের রফতানি বাজারের আকার ১৩৪ দশমিক ৩ কোটি ডলারের হলেও বাংলাদেশ দিতে পারে মাত্র ১০ দশমিক ১ কোটি ডলারের পোশাক। চাহিদার মাত্র ৭ দশমিক ৪৯ ভাগ। নারীদের কটন জ্যাকেট এবং ব্লেজার: ১৪৮ দশমিক ৬ কোটি ডলারের বাজার চাহিদার বিপরীতে ৮ দশমিক ৩ কোটি ডলারের পোশাক সরবরাহ করে বাংলাদেশ। চাহিদার মাত্র ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ দখলে বাংলাদেশের।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত নিয়ে কাজ করে আসছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তার পরামর্শ, উচ্চমূল্যের বাজার ধরতে হলে শ্রমিকদের যেমন দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে তেমনি কাজের পরিবেশ, পোশাকের ডিজাইন থেকে উৎপাদন- প্রতিটি ধাপের জন্য বাড়াতে হবে গবেষণার পরিসর। এ জন্য উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ করতে হবে। তবে বাজার বুঝে বিনিয়োগ করলে তা তারা তুলেও আনতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রেও তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা হতে হবে বাস্তবসম্মত। 

উচ্চমূল্যের বাজার ধরতে জোর দিতে হবে অনলাইন মার্কেটিংয়েও। কারণ, বর্তমানে পোশাকের বাজারের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশই চলে ভার্চুয়াল এই মাধ্যমে। তাই অর্থনীতি বিশ্লেষকদের পরামর্শ, এই মাধ্যমেও লেনদেন ও ক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।