জেল-জরিমানার পরও বেপরোয়া মানুষ

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণ রোধে কঠোর বিধিনিষেধের ৯ম দিন ছিল গতকাল শুক্রবার। কিন্তু বিধিনিষেধ আরোপে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের শিথিলতায় রাজধানীতে এদিন যানবাহন ও মানুষের অবাধ চলাচল চোখে পড়েছে। পুলিশ চেকপোস্ট কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো আইন প্রয়োগে কঠোরতার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারছে না। আর জীবিকার তাগিদও মানুষকে অসহিষ্ণু করে বাইরে বের করে আনছে।

গত ৯ দিনে ঢাকা মহানগর পুলিশ বিনা প্রয়োজনে ও মাস্ক ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়ায় গ্রেফতার করেছে প্রায় ৭ হাজার জনকে। আর জরিমানা করা হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার ব্যক্তিকে। কিন্তু এর পরও মানুষের অবাধ চলাচল রোধ করা যাচ্ছে না। শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে যাত্রাবাড়ীর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কয়েকটি চেকপয়েন্ট ও আশপাশের এলাকা এবং মিরপুরের গাবতলীতে এমনই দৃশ্যের দেখা মিলেছে।

ভোলায় পকেটে মাস্ক রেখে বাজারে ঘোরাঘুরি করছে মানুষ, পুলিশ দেখলে ডাকে মুখ | দৈনিক বাংলার কন্ঠ

যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দুটি চেকপোস্ট শুক্রবারও ছিল আগের দুদিনের মতো প্রায় নিষ্ক্রিয়। অন্যদিকে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কৌশলে অনেকেই ঢুকছেন রাজধানীতে। গতকাল মিরপুর গাবতলী চেকপোস্টে বোরকার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন এক যুবক। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আলম নামে ঐ যুবক জানান, সাভারের হেমায়েতপুর থেকে হেঁটেই রাজধানীতে এসেছেন তিনি, যাবেন যাত্রাবাড়ী। তবে যাত্রাবাড়ী কার কাছে যাবেন, পরিচিত নাকি আত্মীয় সে বিষয়ে একেক সময় একেক তথ্য দিচ্ছিলেন তিনি।

তিনি বলেন, লকডাউনে রাস্তায় বের হলে পুলিশ গ্রেফতার করে, সেজন্য তিনি বোরকা ও পায়ে মোজা পরে গাবতলী দিয়ে হেঁটে রাজধানীতে ঢোকার পরিকল্পনা করেছিলেন। এ সময় তার আচরণ সন্দেহজনক হওয়ায় রাজধানীতে প্রবেশের অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না জানতে তার দেহ তল্লাশি করে পুলিশ। গাবতলী চেকপোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ সার্জেন্ট আবু সুফিয়ান বলেন, আমরা ছেলেটির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি।

সড়কে চেকপোস্টগুলোতে দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘চেকপোস্টগুলোতে এখন কার্যক্রম যেমন দেখছেন সেভাবেই চলছে। এভাবে লকডাউন হয় না।’ এক কর্মকর্তা বললেন, ‘অনেক অফিস খোলা। আমি যদি বাইরে আসা ৫০০ জনকে ধরি, প্রত্যেকের জবাব আছে এবং সবার জবাবই যৌক্তিক। সব বন্ধ না করে আসলে এভাবে লকডাউন হয় না। শ্রমজীবী মানুষের খাবার সরকার নিশ্চিত করতে পারছে না, তাকে আপনি কোন যুক্তি দিয়ে ঘরে আটকে রাখবেন? সে বাইরে আসছে, আসবে। এতে তো লকডাউনের উদ্দেশ্যও ব্যাহত হয়।’

কঠোর এই লকডাউনের ৯ম দিনে সড়কে চলতে দেখা যায়নি খুব বেশি যানবাহন। প্রধান সড়কগুলো অন্যদিন যানবাহনে ভরপুর থাকে। গতকাল শুক্রবার কোনো যানবাহনই দেখা যায়নি। বাজারের চিত্রও ছিল প্রায় একই রকম। সেখানেও মানুষ ছিল কম।

তবে জরুরি প্রয়োজন ছাড়াও সাধারণ মানুষের বাইরে বের হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। অনেকে ঘর থেকে বাইরে বের হচ্ছেন অপ্রয়োজনে। যারা বাইরে বের হচ্ছেন তাদের অনেককে মাস্ক পরতেও দেখা যায়নি।

তবে গতকাল ছুটির দিন হওয়ায় রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ছিল কম। এ ছাড়া রিকশার চলাচলও অন্যান্য দিনের তুলনায় কিছুটা কম ছিল। যানবাহন কম হলেও মূল সড়ক ও গলিতে সাধারণ মানুষের চলাফেরা করতে দেখা যায়। গলির ভেতরে নেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বালাই। সাধারণ মানুষ বিশেষ করে রিকশাচালকদের অধিকাংশই মাস্ক পরছেন না। যাদের সঙ্গে মাস্ক রয়েছে তারাও স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঠিকঠাক মাস্ক পরছেন না। অনেকেরই মাস্ক থুতনিতে।

উল্লেখ্য, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় গত ১ জুলাই সকাল ৬টা থেকে শুরু হয় সাত দিনের কঠোর বিধিনিষেধ। এই বিধিনিষেধ ছিল ৭ জুলাই মধ্যরাত পর্যন্ত। পরে বিধিনিষেধের মেয়াদ আরো সাত দিন অর্থাত্ ১৪ জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে ২১টি শর্ত দেওয়া হয়। শর্ত অনুযায়ী, এ সময়ে জরুরি সেবা দেওয়া দপ্তর-সংস্থা ছাড়া সরকারি-বেসরকারি অফিস, যন্ত্রচালিত যানবাহন, শপিংমল দোকানপাট বন্ধ থাকবে। খোলা থাকবে শিল্পকারখানা। জনসমাবেশ হয় এমন কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যাবে না এ সময়ে।