টিকা নিয়ে ধোঁয়াশা

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের একজন নার্সকে করোনাভাইরাসের টিকা দেয়ার মধ্য দিয়ে গত ২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে বহুল প্রতীক্ষিত টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। সেখানে কোনো জটিলতা দেখা না দেয়ায় ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় সারাদেশে গণ টিকাদান। তবে ৮ এপ্রিল থেকে টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেয়া শুরুর কথা থাকলেও নতুন করে টিকা পাওয়া নিয়ে সঙ্কটের মুখে পড়েছে দেশ। এমনকি প্রথম ডোজ পাওয়া সবাইকে দ্বিতীয় ডোজ দেয়ার মতো পর্যাপ্ত টিকাও এ মুহূর্তে স্বাস্থ্য বিভাগের হাতে নেই।

প্রথম দিকে দ্বিতীয় ডোজের জন্য এক মাস পরের তারিখ লিখে দেয়া হয়েছিল। তবে দুই ডোজের মধ্যে ব্যবধান বাড়লে টিকার কার্যকারিতাও বাড়ে- এমন তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনার সুপারিশ করে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। এরপর মোবাইলে ক্ষুদে-বার্তা পাঠিয়ে টিকা গ্রহীতাদের নতুন তারিখ জানিয়ে দেয়া হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এবিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, সেরাম ইন্সটিটিউট থেকে যথাসময়ে টিকা না এলে তারা ‘অন্য পরিকল্পনা’ করবেন।

যদিও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, টিকা নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে এবং তারা আশা করছেন চাহিদা মতো টিকা সময়মতই পেয়ে যাবেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতানা বলেন, টিকা নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই, কাজ চলছে। সময়মতই টিকা পাবে দেশ। তাই কোন সঙ্কট হবে না।

তিনি আরো বলেন, দ্বিতীয় ডোজ দেয়া শুরুর আগে প্রথম ডোজ দেয়া সাময়িকভাবে বন্ধ করা হবে। আবার দ্বিতীয় ডোজ দেয়ার মধ্যেই নতুন করে টিকা আসা নিশ্চিত হয়ে যাবে। এরপর আবার নতুন করে টিকা দেয়ার কার্যক্রম শুরু হবে। ফলে সঙ্কটের আশঙ্কা নেই।

আগামী ৮ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেয়া শুরুর কথা থাকলেও প্রথম ডোজ দেয়া এখনো চলমান। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ভারত থেকে টিকা না আসায় ৫ এপ্রিলের পর আপাতত আর করোনার প্রথম ডোজ টিকা দেবে না সরকার।

২৫০ শয্যা বিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আয়শা আক্তার বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, প্রথম ডোজের টিকা কবে নাগাদ শেষ হবে এখনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। তবে টিকার দ্বিতীয় ডোজ ৮ তারিখ থেকেই শুরু হবে।

জানুয়ারি থেকে গত তিন মাসে বাংলাদেশের কেনা টিকার মধ্যে দেড় কোটি ডোজ আসার কথা থাকলেও স্বাস্থ্য বিভাগের হিসেবে এখন পর্যন্ত অর্ধেকেরও কম টিকা পেয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো সেরাম ইন্সটিটিউট ছাড়া অন্য কোন সূত্র থেকে টিকা আনার জন্য আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি এখন পর্যন্ত করতে পারেনি দেশ।

এমন পরিস্থিতিতে সেরাম ইন্সটিটিউট চুক্তি অনুযায়ী টিকা দিতে ব্যর্থ হলে স্বাস্থ্য বিভাগ গভীর সঙ্কটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আবার প্রথম ডোজ দেয়া বন্ধ করা হলে, যারা টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন তাদেরও অনেকের টিকা না পাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে।

তবে এর আগে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জানিয়েছিলো, যারা ইতোমধ্যে করোনাভাইরাসের টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন, তাদের দ্বিতীয় ডোজ দেয়া হবে দুই মাস পর।

টিকা আনার ক্ষেত্রে যে পরিকল্পনা করা হয়েছিলো, তাতে প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ হিসেবে মোট তিন কোটি ডোজ টিকা আনার কথা ছিলো ছয় মাসের মধ্যে।

স্বাস্থ্য বিভাগের হিসেবে ২৯ মার্চ দুপুর পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট টিকা নিয়েছেন ৫২ লাখ ৬৩ হাজার ২৪৮ জন। নিবন্ধন করেছেন ৬৭ লাখ ৩৭ হাজার ৯৯০ জন।

অন্যদিকে এর বিপরীতে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে এক কোটি দুই লাখ ডোজ টিকা, যার মধ্যে ৩২ লাখ ডোজই ভারত সরকারের উপহার হিসেবে পাওয়া।

আর বেক্সিমকো ও সেরাম ইন্সটিটিউটের মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী যে তিন কোটি ডোজ আসার কথা তার মধ্যে গত ২৫ জানুয়ারি ৫০ লাখ আর ২৩ ফেব্রুয়ারি এসেছে ২০ লাখ ডোজ।

এখন ভারত রপ্তানি সাময়িক স্থগিত করায় বাকি টিকা কবে আসবে তা নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

আইইডিসিআর’র পরামর্শক ডা. মুশতাক হোসেন বলছেন, টিকা নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা আছে কিন্তু এটা বৈশ্বিক সমস্যা। বাংলাদেশের জন্য এটা বড় কোনো সমস্যা হবে না। তাছাড়া সেরামের পাশাপাশি অন্য সূত্রগুলো থেকেও চেষ্টা করার কথা সরকার বলছে। যে ধরণের তৎপরতা আছে তাতে আশা করছি টিকা চলে আসবে।

এর আগে গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও ভ্যাকসিন ডেপ্লয়মেন্ট কমিটির অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, প্রথম ডোজের টিকা যারা নিয়েছে তাদের জন্য দ্বিতীয় ডোজের টিকা সুরক্ষিত আছে। তবে এ কথা সত্যি, সবার জন্য দ্বিতীয় ডোজের টিকা নেই। কিন্তু যখন শুরু করবো, টিকা যাতে এসে যায় সে বিষয়ে আমরা কাজ করছি।

এ মুহূর্তে ৪২ লাখ ডোজ মজুত আছে জানিয়ে তিনি আশা করেন যে, আগামী মাসে কিছু টিকা তারা পাবেন যার ভিত্তিতে সবার (প্রথম ডোজ নেয়া) দ্বিতীয় ডোজ দেয়া নিশ্চিত হবে।

ওইদিনই হৃদরোগ ইন্সটিটিউটে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সেরাম ইন্সটিটিউট থেকে সময়মতো টিকা না পেলে অন্য পরিকল্পনা নেবেন তারা। যদিও সেই পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য তিনি দেননি।

মন্ত্রী বলেছেন, এ মাসের টিকা আমরা পাইনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে টিকার বিষয়ে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। টিকা পেতে দেরি হলে আমাদের অন্য পরিকল্পনা করতে হবে।

এর আগে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছেন, করোনা ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ পাওয়া নিয়ে কোনো সংশয় নেই। ভ্যাকসিনের জন্য টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, তাই ভ্যাকসিন না পাওয়ারও কোনো কারণ নেই। বুধবার (৩১ মার্চ) মন্ত্রিসভা কমিটির ১৩তম সভায় ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ পাওয়া নিয়ে নানা অনিশ্চয়তার মাঝে এই সুখবর দেন অর্থমন্ত্রী।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম ৩ জনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এর ১০ দিন পর ১৮ মার্চ দেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম একজনের মৃত্যু হয়। এখন পর্যন্ত ভাইরাসটিতে মোট ৯ হাজার ২১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।এছাড়া মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৩০ হাজার ২৭৭ জনে। চলতি বছরে করোনার সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় সরকার সোমবার (৫ এপ্রিল) থেকে সারাদেশে সাতদিনের লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেয়।