নারী দিয়ে ফাঁসিয়ে অপহরণ ও অর্থ আদায় তাদের পেশা

রাজশাহীতে নারী দিয়ে প্রেমের ফাঁদ পেতে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসিয়ে অপহরণ, প্রাণনাশের হুমকি ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত ছিল একটি সংঘবদ্ধচক্র। ডিবি ও সাংবাদিকের ভুয়া পরিচয়ও ব্যবহার করতেন অপহরণ ও প্রতারণার সময়। ভয় দেখাতে ব্যবহার করতেন নকল পিস্তল, পুলিশের হ্যান্ডকাফ। এমনকি মারধরও করতেন ভুক্তভোগীদের। অবশেষে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে ধরা পড়ে চক্রটি।

গতকাল শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টায় কাশিয়াডাঙ্গা থানার হড়গ্রাম কোর্টবাজার চৌরাস্তা এলাকা থেকে প্রতারকচক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়। আজ শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাজশাহী মেট্রোপলিটন পলিশ (আরএমপি) কমিশনার আবু কালাম সিদ্দিক। তিনি বলেন, ‘চারঘাট শাখার অগ্রণী ব্যাংকের ম্যানেজার বকুল কুমার তার সহকর্মী নিপেন্দ্র নাথ ও তার পরিবারের কাছে বিমর্ষভাবে বিকাশে টাকা চাওয়ার অনুরোধ করেন। এতে সন্দেহ হয় সহকর্মী নিপেন্দ্র নাথের। পরবর্তীতে তিনি নগর গোয়েন্দা শাখায় এসে বিষয়টি জানান। তার দেওয়া দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নগরীর কাশিয়াডাঙ্গার কোর্টবাজারে প্রতারকচক্রের বাসায় অভিযান পরিচালনা করে অপহরণকারী প্রতারকচক্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রতারকচক্রের ভাড়াবাসার সামনে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ভুক্তভোগী ব্যাংক ম্যানেজারকে।’

তিনি বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন-রাজশাহী জেলার চারঘাট থানার মোঃ মনোয়ার হোসেন (৩৬) (মূল হোতা)। মনোয়ার সাবেক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিপাহী ছিলেন। একই এলাকার মোসাঃ সেলিনা আক্তার সাথী (২৫) ও খাইরুল ইসলাম(২৬), অন্যদিকে পটুয়াখীল জেলার রাংগাবলী থানার মোঃ তুহিন (৩২)।’

ঘটনা সম্পর্কে পুলিশেষ ভাষ্য, প্রতারকচক্রের মূলহোতা মোঃ মনোয়ার হোসেন মোসাঃ সেলিনা আক্তার সাথীকে নিজের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে কাশিয়াডাঙ্গায় রিয়াজুল ইসলামের তিন তলা বাসা ভাড়া নেন। এরপর সাথী পরিকল্পনামাফিক চারঘাট শাখার ব্যাংক ম্যানেজার বকুল কুমারকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে কৌশলে তার বাসায় ডাকেন। ওই সময় পাশে লুকিয়ে থাকা প্রতারক খাইরুল ডিবি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও তুহিন সাংবাদিক হিসেবে নিজেদের পরিচয়ে ঘরে ঢুকেন।

এসময় খাইরুল ব্যাংক ম্যানেজারকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নকল পিস্তল ঠেকিয়ে মেয়েসহ জেলে দেওয়ার হুমকি দেন। অন্যদিকে, প্রতারক তুহিন ভুক্তভোগীকে টাকা না দিলে মেয়েসহ তার ছবি সংবাদপত্রে প্রকাশ করে দিবে বলে হুমকি দেয় এবং মারধরও করেন।

এতে বেকায়দায় পড়ে ভুক্তভোগী জীবন বাঁচাতে তার পকেটে থাকা নগদ ২৬ হাজার টাকা বের করে দেন। এছাড়া মুক্তিপন ও চাঁদা হিসেবে প্রতারক চক্র আরও অর্থ দাবি করে। এতে নিজের মোবাইল ফোন থেকে পরিবার ও সহকর্মীদের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে মোট ৪৪ হাজার টাকা এনে মুক্তিপন ও চাঁদা হিসেবে প্রদান করেন।

পুলিশ কর্তৃপক্ষ জানান, বিকাশ লেনদেনের তথ্য সূত্র ধরে মহানগরের বিভিন্ন এলাকা হতে ডিবি পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে প্রতারকচক্রের মূলহোতাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে।

পুলিশ জানিয়েছে, প্রতারকরা প্রায় এক মাস ধরে বাসা ভাড়া নিলেও নিয়মিত বাসায় থাকে না। দিনব্যাপী তারা চষে বেড়ান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নারী দিয়ে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসিয়ে ভুয়া ডিবি ও সাংবাদিক পরিচয়ে অপহরণ, প্রাণনাশের হুমকি এবং চাঁদা আদায় করে আসছে এই চক্র। প্রতারক চক্রের কাছে থেকে একটি নকল পিস্তল, একটি হ্যান্ডকাফ, একটি ভুয়া ডিবি জ্যাকেট, ছয়টি মোবাইল, নয়টি সিমকার্ড, ১০০ ডলারের নকল নোট ১টি, সেনাবাহিনীর পোশাক পরিহিত ছবি ৪ কপি, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভিজিটিং কার্ড উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও ভুক্তভোগীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া অর্থের ১৫ হাজার ৫০০ টাকা ও তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়।

এ বিষয়ে নগর পুলিশের মুখপাত্র গোলাম রুহুল কুদ্দুস জানান, আজ সকালে প্রেস ব্রিফিং শেষে আসামিদের প্রতারণা, হত্যা হুমকি, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ বিভিন্ন মামলায় আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। অপরাধ দমন ও জনগণের সহায়তায় পুলিশের কাজ। সুতরাং, নগরীর কোথাও এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে পুলিশকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়ারও আহ্বান জানান পুলিশের ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা।