পিয়াসার জালে ছিল শতাধিক উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান

আলোচিত মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসার (৩০) বাসায় নিয়মিত নাচ-গানের আসর বসত। এই আসরকে প্রাণবন্ত করে তুলতে তিনি নেচে-গেয়ে অতিথিদের আনন্দ দিতেন। আর আসরকে জমাতে থাকত নানা ধরনের মাদক। এভাবেই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের নিজের জালে ফাঁসাতেন পিয়াসা। তিন দিনের রিমান্ডে ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে এমন সব তথ্য জানিয়েছেন তিনি।

গতকাল মঙ্গলবার ছিল তিন দিনের রিমান্ডের দ্বিতীয় দিন। ডিবির যুগ্ম-কমিশনার হারুন অর রশীদ ইত্তেফাককে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে পিয়াসা এমন সব নাম বলছে, যা শুনলে চমকে উঠতে হয়। অনেকেই প্রতারিত হয়েছেন তার কাছে। কয়েক জন ইতিমধ্যে অভিযোগ নিয়ে এসেছেন। শীর্ষ ধনী থেকে শুরু করে উঠতি ধনী কেউই বাদ যায়নি পিয়াসার জাল থেকে। এ পর্যন্ত শতাধিক যুবকের নাম পাওয়া গেছে পিয়াসার কাছ থেকে। এর মধ্যে কারা প্রতারিত আর কারা তার পৃষ্ঠপোষক তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, বারিধারার ৯ নম্বর রোডের ৩ নম্বর বাসার তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটটি আলিশান। যেখানে রাত হলেই বসত মদ ও সিসার আসর। আসরের মধ্যমণি হয়ে যোগ দিতেন দেশের ব্যবসায়ী ও বিত্তশালী পরিবারের সন্তানেরা। তাদের মনোরঞ্জনের জন্য তৈরি থাকত সুন্দরী রমণীরা। রমণী সংগ্রহ ও সরবরাহের কাজটি সুচারুভাবে সম্পাদন করতেন ২০০৯ সালে সুপার হিরোইন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শোবিজ জগতে পা রাখা ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা। পিয়াসার আস্থাভাজন হিসেবে মনোরঞ্জন-বাণিজ্য দেখভাল করত আরেক মডেল মরিয়ম আক্তার মৌ। নিজেদের আস্তানায় কাঙ্ক্ষিত পুরুষ এলে অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের শিকার বানিয়ে ফেলতেন দুই জনই। ক্যামেরায় অন্তরঙ্গ দৃশ্য ধারণ করে, পরে করতেন ব্ল্যাকমেইল। শুরু হতো অর্থ আদায়। এভাবে উচ্চবিত্তদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে বিলাসী জীবন কাটাতেন তিনি।

ডিবি সূত্র জানায়, পিয়াসা ও মৌর কর্মকাণ্ড নিয়ে গোপনে মাঠে নামে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট। যুগ্ম-কমিশনার হারুন অর রশিদ জানান, পিয়াসা ও মৌ দীর্ঘদিন ধরেই তাদের বাসায় মদ, নারী ও সিসার আসর বসাতেন। এরপর তারা কৌশলে এসব দৃশ্য ধারণ করে রাখতেন। এরপর ঐ ভিডিও দেখিয়ে তারা অর্থ হাতিয়ে নিতেন। এ ধরনের একাধিক অভিযোগের পর তদন্ত শেষে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

সূত্র মতে, কোরবানির ঈদের আগে লকডাউন শুরু হলে অর্থ কষ্টে পড়েন পিয়াসা। বিশেষ করে লকডাউনে জনসাধারণের চলাচল নিয়ন্ত্রিত থাকার কারণে ঐ ফ্ল্যাটে আসর না জমায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ সময় মৌ ও পিয়াসা কয়েক জন ব্যবসায়ীর কাছে অর্থ সহায়তা চান। যারা প্রতিনিয়ত তাদের বাসায় আসা-যাওয়া করতেন। কিন্তু ঐসব ব্যবসায়ী তাদের টাকা দিতে অপারগতা জানান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ব্যবসায়ীর বউকে ফোন করেন পিয়াসা এবং তার কাছে ব্যবসায়ীর ভিডিও আছে বলে জানান। এ নিয়ে ঐ পরিবারে অশান্তি তৈরি হয়। এরপর ঐ ব্যবসায়ী গোয়েন্দা পুলিশের সহযোগিতা চান। পুলিশের তদন্তে থলের বিড়াল বের হয়ে আসে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামেই জন্ম ও মডেলিংয়ে হাতেখড়ি হয়েছিল পিয়াসার। ২০০৯ সাল থেকে ঢাকার অভিজাত মহলে পরিচিতি পান মডেল পিয়াসা হিসেবে। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠলেও অল্প সময়ের মধ্যে ৩২ বছর বয়সী পিয়াসার হাত হয়ে উঠে অনেক লম্বা। তাকে সমীহ করে চলেন অনেক বাঘা বাঘা শিল্পপতিও। অভিযোগ রয়েছে কক্সবাজারে হোটেল হোয়াইট সেন্ট নামের একটি প্রকল্পের কথা বলে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন সাড়ে ৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের গল্পে ভুলিয়েছেন চট্টগ্রামের বেশকিছু ব্যবসায়ীকেও।