বন্যার আরো অবনতি

টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-মধ্যাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোর বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে। সাতটি প্রধান নদনদীর পানি ১৮টি পয়েন্টে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বাড়ার ফলে প্রতিদিনই প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। পানি ও ভাঙন বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় অসহায় হয়ে পড়েছে নদীপাড়ের মানুষ।

শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে বহু এলাকায়। বেড়েছে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ ও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, শরিয়তপুর ও চাঁদপুর জেলার নিম্নাঞ্চল পুরোপুরি পানির তলে। সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি এক দিনেই বেড়েছে ৮ সেন্টিমিটার। যমুনার পানি বিপত্সীমার ৩৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিপত্সীমার ওপরে পদ্মা-তিস্তা-ধরলা-ব্রহ্মপুত্র-ধলেশ্বরী-দুধকুমারের প্রবাহ। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

এদিকে সাগরে ফের লঘুচাপের কারণে বাড়তে পারে বৃষ্টি। এতে ভয়াবহ হতে পারে বন্যা পরিস্থিতি। আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক বলেন, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও কাছাকাছি এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এটি আগামী দুই দিনের মধ্যে ভারতের ওড়িশা পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করবে। বগুড়া পা?নি উন্নয়ন বো?র্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান জানান, ভারতের অরুণাচল, আসাম এবং মেঘালয়ের বৃষ্টির পানি যমুনায় নামছে। যমুনা থেকে পানি পদ্মায় গিয়ে পড়ে। কিন্তু পদ্মায় পানি বেশি থাকায় যমুনার পানি নামতে পারছে না। যে কারণে যমুনায় পানি বেড়ে ফুলেফেঁপে উঠছে। পানি আরো তিন-চার দিন পর্যন্ত বাড়তে পারে।

টাঙ্গাইল জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইলে যমুনা নদীর পানি বিপত্সীমার ৩৪ সেন্টিমিটার, ধলেশ্বরী নদীর পানি ৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বাড়ার ফলে বিভিন্ন এলাকার মানুষ বন্দি হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। পদ্মা নদীর পানি রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া গেজ স্টেশন পয়েন্টে গতকাল বিপত্সীমার ৪৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয

ঘিওর (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, উত্তাল পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে হরিরামপুর উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। বারবার কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরেও ভাঙনরোধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। স্থানীয় আজিমনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, শনিবার রাত ১১টার দিকে তীব্র স্রোতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটির ৭০ ভাগেরও বেশি অংশ নদীতে চলে গেছে। বাকি অংশটুকু নদীতে গেছে আজ সকালে।

তিনি আরো বলেন, ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা করতে এবারও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ কোনো উদ্যোগই নেয়নি। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে, পদ্মা নদীর গর্ভে বিলীন হয় একই উপজেলার সুতালড়ী রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এছাড়া চলতি বছর, শতাধিক বাড়ি-ঘর, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ইতিমধ্যেই নদীতে চলে গেছে। ভাঙনের মুখে পড়েছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, পানি বাড়ার ফলে প্রতিদিনই প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। গত ১৪ আগস্ট থেকে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার নদী তীরবর্তী আরো কিছু নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এসকল এলাকার বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাটে পানি উঠে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন বন্যা দুর্গতরা।

স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া জানান, যমুনা নদীর পানি বেড়েই চলেছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নদী তীরবর্তী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসংলগ্ন নিচু এলাকার বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং চরাঞ্চলের ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। ধুনট উপজেলার শহরাবাড়ী, শিমুলবাড়ী, কৈয়াগাড়ী এলাকার তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। পানি ঢুকতে শুরু করছে শহরাবাড়ী, শিমুলবাড়ী, বানিয়াযান, বরইতলী, কৈয়াগাড়ী, ভাণ্ডারবাড়ী, পুকুরিয়া ও ভূতবাড়ী গ্রামের বাড়িঘরগুলোতে।

সারিয়াকান্দি (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, পানি বাড়তে থাকায় যমুনার চরবেষ্টিত কাজলা, চালুয়াবাড়ী, হাটশেরপুর, কর্নিবাড়ী, বোহাইল, চন্দনবাইশা ও সারিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নের নিচ জমির রোপ আমনসহ অন্যান্য ফসল তলিয়ে গেছে। ঐ ইউনিয়নের ৫৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে নিচু এলাকার ১০ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ও ৮৫ হেক্টর জমির সবজি খেত।