মঙ্গলে ছোট হেলিকপ্টার উড়িয়ে ইতিহাস গড়ল নাসা

নাসা

আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা প্রথমবারের মত মঙ্গলগ্রহের পৃষ্ঠ থেকে সফলভাবে একটি ছোট হেলিকপ্টার (ড্রোন) ওড়াতে সক্ষম হয়েছে। সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।

‘ইনজেনুয়িটি’ নামের ড্রোনটি মঙ্গলের আকাশে এক মিনিটের কম সময়ে ওড়ে। কিন্তু, নাসা বলছে অন্য কোনো গ্রহের আকাশে এই প্রথম যন্ত্রচালিত ও নিয়ন্ত্রিত কোনো যান ওড়ানোর এই সাফল্যে তারা উল্লসিত।

মঙ্গলগ্রহ থেকে একটি উপগ্রহের মাধ্যমে পৃথিবীতে পাঠানো তথ্যে ড্রোন ওড়ার এই খবর পৌঁছায়।

নাসা বলছে, এই সাফল্য সামনের দিনগুলোতে আরও দুঃসাহসিক উড়োযান ওড়ানোর পথ প্রশস্ত করল।

এই হেলিকপ্টারের ওড়ার ছবি নাসার নিয়ন্ত্রণ কক্ষে পৌঁছানোর পর কর্মীদের উল্লাসে ফেটে পড়তে দেখা যায়। মাত্র এক দশমিক আট কেজি ওজনের ইনজেনুয়িটি হেলিকপ্টারটি মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে উড়ে ৪০ সেকেন্ড পর সফলভাবে অবতরণ করে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইনজেনুয়িটি ড্রোনটির প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা পরীক্ষা করার পর এটিকে এখন তাঁরা আরও উঁচুতে এবং আরও দূর পর্যন্ত ওড়াতে চান।

নাসার ‘পারসিভেয়ারেন্স’ রোভার যান এই ড্রোনটি বহন করে মঙ্গলে নিয়ে গেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে এই পারসিভেয়ারেন্স মঙ্গলের পৃষ্ঠে জেজেরো গহ্বরে অবতরণ করেছিল।

আশা করা হচ্ছে, এরপর থেকে এরকম ড্রোন দিয়ে মঙ্গল বা অন্য কোনো গ্রহের ভূ-প্রকৃতি ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ অনেক সহজ হবে।

ক্যালিফোর্নিয়ায় নাসার এক গবেষণাগারে ইনজেনুয়িটি প্রকল্পের ব্যবস্থাপক মিমি অং বলেন, ‘আমরা এখন বলতে পারি, মানুষ আরেকটি গ্রহের আকাশে ড্রোন জাতীয় আকাশযান উড়িয়েছে।’

“আমরা অনেক দিন ধরে আলোচনা করেছি যে, মঙ্গলের আকাশে ‘রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রথম উড়োজাহাজ ওড়ানোর মুহূর্ত’ কবে আসবে। আজ আমরা সেই মুহূর্তে পৌঁছাতে পারলাম’, যোগ করেন মিমি অং।

দু্ই ভাই—উইলবার আর অরভিল রাইট—১৯০৩ সালে পৃথিবীর আকাশে প্রথম শক্তিচালিত উড়োজাহাজ উড়িয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। মঙ্গলে নাসার ড্রোন ওড়ানোকে তেমনই এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলে ব্যাখ্যা করেন মিমি অং।

নাসার নিয়ন্ত্রণ কক্ষে যখন ইনজেনুয়িটি ড্রোনের মঙ্গলগ্রহের আকাশে ওড়ার ছবি এসে পৌঁছায়, তখন উল্লসিত কর্মীদের পেছনে মিমিকে বলতে শোনা যায়—‘এটা বাস্তব!’

ড্রোনটি কোনো কারণে উড়তে ব্যর্থ হলে যে ভাষণ দেবেন বলে মিমি কাগজে বক্তব্য লিখে রেখেছিলেন, আনন্দে তিনি সেই কাগজ ছিঁড়ে ফেলেন।

নাসার ছবিতে দেখা যায়, মঙ্গলের বুক থেকে মাত্র ইনজেনুয়িটি ড্রোনটি প্রায় তিন মিটার ওপরে ওঠে; ড্রোনের পাখাগুলো ঘুরতে দেখা যায়; ড্রোনটি এদিক-ওদিকে যায় এবং প্রায় ৪০ সেকেন্ড পর আবার সফলভাবে মঙ্গলের মাটিতে নেমে আসে।

মঙ্গলের মাটি থেকে কোনো বায়ুযান গ্রহটির আকাশে ওড়ানো সহজ নয়। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল খুবই পাতলা। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ঘনত্বের মাত্র এক শতাংশ ঘনত্ব গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের। এর ফলে কোনো পাখাওয়ালা উড়োযানের জন্য বাতাস কেটে খুব বেশি ওপরে ওঠা খুব কঠিন।

মঙ্গলগ্রহের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কিছুটা সাহায্য করে বটে, তবে মাটি থেকে এ ধরনের ড্রোন বা হেলিকপ্টার মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে তোলার জন্য অনেক কষ্ট করতে হয়।

নাসার ঘোষণা অনুযায়ী, মঙ্গলগ্রহের জেজেরো গহ্বরের যে জায়গায় পারসিভেয়ারেন্স নভোযান ইনজেনুয়িটি ড্রোনটিকে নামায় সেই জায়গাটিকে এখন থেকে ‘রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের অবতরণক্ষেত্র’ নাম দেওয়া হবে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রথম উড্ডয়ন সফল হওয়ার পর আগামী দিনগুলোতে তাঁরা আরও চারটি ফ্লাইট ওড়ানোর চেষ্টা করবেন। প্রতিটি ফ্লাইটে হেলিকপ্টারটিকে একটু একটু করে বেশি দূর পর্যন্ত ওড়ানো হবে।

নাসার উৎফুল্ল বিজ্ঞানীরা বলছেন, তাঁরা এখন ড্রোন উড়িয়ে মঙ্গলগ্রহের পৃষ্ঠদেশ, গহ্বর ও গহ্বরের দেয়াল থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। ইনজেনুয়িটি ড্রোনের এই সাফল্য তাঁদের সামনে মঙ্গলগ্রহকে জানার বিরাট সম্ভাবনার পথ খুলে দিল।