মুজিববর্ষ ও রাষ্ট্রপ্রধানদের আগমনকে ইতিবাচক দেখছে বিএনপি

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, মুজিব সবারই শ্রদ্ধার পাত্র। দেশের স্বাধীনতা অর্জনে অগ্রগণ্যের’ ভূমিকা পালন করেছেন যিনি, তার জন্মশতবার্ষিকী ঘটা করে পালন করাটা অস্বাভাবিক কিছু না। তবে এ উপলক্ষে আলাদা কোনো কর্মসূচি রাখেনি দলটি।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে আগামী ১০ দিন দলীয় কর্মসূচি স্থগিত করেছে বিএনপি। এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মুজিবুর রহমান অবশ্যই জাতির ইতিহাস। তার সম্মান, তার মর্যাদা তাকে দিতে হবে। তার জন্মশতবার্ষিকী পালন ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে বিএনপি। তিনি বলেন, এটা আমাদের জাতির সম্মান এবং মর্যাদার প্রশ্ন, আমরা অবশ্যই সেটাকে সেইভাবে দেখব। বিদেশ থেকে রাষ্ট্রীয় মেহমানরা আসবেন। আমরা যথাসম্ভব নিঃসন্দেহে সেটাকে সহযোগিতা করব।

তবে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী এবং বামপন্থী দলগুলোর আপত্তির মুখেই মুজিব জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানোর সমালোচনা করেছেন বিএনপির নেতারা। তারা বলছেন, তার আমন্ত্রণের বিষয়ে প্রশ্ন তোলার পেছনে দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে তাদের ভারতবিরোধী যে রাজনীতি, সেই রাজনীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। আর একটি হচ্ছে বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজ করছে, তার উস্কানি দেওয়া। এ নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলের বক্তব্য- দিল্লিতে যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলো, তখন মোদী আসছেন আমাদের দেশে। অভিযোগ আছে, এ দাঙ্গার সঙ্গে মোদীর দল জড়িত। এই সময়ে বাংলাদেশে আসাটা কতটুকু শোভনীয় হচ্ছে, সেটা অবশ্যই চিন্তা করা উচিত।

বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারিভাবে মুজিববর্ষ উদযাপানের ঘোষণা আসার পর থেকেই দলীয়ভাবে এই দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে দলটির নেতারা। নীতি-নির্ধারকদের মতে, দলীর চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে অংশগ্রহণ করা রাজনৈতিক কৌশলগত ভুল হবে।

অন্য অংশ মনে করে মুজিববর্ষ পালনের মধ্যে দিয়ে বিএনপির উদার রাজনৈতিক দলের পরিচয় মিলবে। এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠকে নেতাদের পাল্টা-পাল্টি যুক্তি খণ্ডনের পরে দিবসটি পালন না করার সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। তবে আগামী বছর জাতীয় শোক দিবসকে কেন্দ্র করে বিএনপির পক্ষ থেকে একটি দলীয় বিবৃতি বা বক্তব্যের সম্ভাবনা আছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খোন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের অবিসংবাদিত নেতা এটা অস্বীকার করতে চাই না। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়া যতবার জাতির উদ্দেশে বক্তব্য রেখেছেন, দেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের জন্য অবদান রেখেছেন, তাদের সকলকে স্মরণ করতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নামও স্মরণ করেছেন। তাই মুজিববর্ষ পালনের বিষয়টি বিএনপি ইতিবাচক হিবেই দেখছে।

ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান একজন রাজনীতিক ও মুক্তিযুদ্ধের সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের গুড লিডার। তার প্রতি যে শ্রদ্ধা, সেটা আমাদের আছে। জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আমাদের কোনো কর্মসূচি পালনের কারণ আছে বলে মনে করি না।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আমরা মুজিববর্ষ পালন করব কি না, সেই প্রশ্নই বিব্রতকর। নির্ধারিত জাতীয় দিবসগুলো তো আছেই। দলমত নির্বিশেষে সেগুলো পালন করি। বিএনপির ভাইসচেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান তো শ্রদ্ধার ব্যক্তি। সরকার তার জন্মশতবার্ষিকী ঘটা করে পালন করুক তাতে ক্ষতি কী। আমরাও তো স্বাধীনতার সুবর্নজয়ন্তী পালন করছি।

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ব্যক্তিগতভাবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সুসম্পর্ক ছিল। ১৯৯১ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় এসে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধি জিয়ারত করেছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এরপর ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারত করেন।

বিএনপির চেয়ারপারসনের ঘনিষ্ঠ একাধিক দায়িত্বশীল মনে করেন, দুই দলের চলমান এই বিরোধে সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে খালেদা জিয়ার কারাবরণ। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে তাকে কারাগারে রেখে সর্বজনীনভাবে মুজিববর্ষ উদযাপনে সবচেয়ে বড় বাধা। তারপরও গত কয়েক বছরে খালেদা জিয়ার একাধিক বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় নেতাদের বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি উঠে এসেছে। গত বছরের ২৫ মার্চ নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়াকে অস্থায়ী মুক্তি দেওয়া এবং কয়েক দফা তার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর পরে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দলটির নেতাদের বক্তব্যে মুজিব বন্দনার আভাস পাওয়া যায়।

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, বিগত দিনে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। ঈদে ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে একে অন্যকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, নিজ দলের সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এমনকি পারিবারিক অনুষ্ঠানে যাতায়াত ছিল দুই নেত্রীর। ২০০৭ সালে জুলাইয়ে যখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়, ওই মাসের ১৮ তারিখ তার মুক্তির দাবিতে বিবৃতি দেন খালেদা জিয়া। ওই বিবৃতিতে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে মুক্ত রেখে তার বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনায় আইনগত সুযোগ থাকলে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়া উচিত। শেখ হাসিনাকে মুক্ত রেখে আইন পরিচালনা করা হলে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সন্দেহ, সামাজিক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক আশঙ্কা কমে আসবে।

২০১৬ সালের মার্চে বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিলে নিজের বক্তব্যে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমানসহ প্রয়াত জাতীয় নেতাদের অবদানের কথা স্মরণ করছি। তারা দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছিলেন। এর আগে-পরে বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় নেতাদের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন খালেদা জিয়া।

রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, দুই দলের মধ্যে বিরাজমান সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয় ১৯৯১ সালে। ওই বছর ১৫ আগস্ট প্রথমবারের মতো খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন করা হয়। জন্মদিন পালনকে কেন্দ্র করে শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনা করা হয়। দুই দলের এমন ঠেলাঠেলিকে সহজভাবে নেয়নি নাগরিক সমাজও। এই দুই রাজনৈতিক দলের বিরোধ সৃষ্টির বড় কারণ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরই অভিযোগ করেছেন, ওই হামলায় তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের হাত ছিল।