যে কারণে ভোটকেন্দ্রে বিজিবি সদস্যকে হত্যা করা হয়!

ঢাকা: ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) এক সদস্য নিহতের ঘটনায় মূলহোতা ও প্রধান আসামিকে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড আ্যকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। গ্রেফতার ব্যক্তির নাম মো. মারুফ হোসেন ওরফে অন্তিক। তার বাড়ি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায়।

আজ মঙ্গলবার (১৪ ডিসেম্বর) দুপুরে কারওয়ান বাজার র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন র্যাবের লিগ্যাল আ্যন্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, মারুফ কিশোরগঞ্জ থানাধীন গড়াগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদে জাতীয় পার্টি থেকে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। মারুফের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর ভোটের তুলনায় সামান্য পিছিয়ে থাকায় ফলাফল পরিবর্তনের জন্য (সম্পূর্ণ ভোট তার পক্ষে দেওয়ার জন্য) প্রিজাইডিং কর্মকর্তাকে আটকে রেখে চাপ দিতে থাকেন।

তিনি বলেন, প্রিজাইডিং কর্মকর্তা অপারগতা প্রকাশ করলে গ্রেফতার মারুফসহ তার প্রায় শতাধিক সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে ধারালো দেশীয় অস্ত্র দিয়ে প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, অন্যান্য নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি, কেন্দ্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা করে।

র‌্যাব জানায়, এসময় নির্বাচনী কাজে ব্যবহৃত সরকারি যানবাহন ও নির্বাচন কেন্দ্রে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। এরপরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিজিবি টহল দল উপস্থিত হলে মারুফ হোসেন ও তার সমর্থকরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে বিজিবি সদস্যদের ওপর চড়াও হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে গুরুতর জখমের ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নায়েক রুবেল ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, বলেন, গত ২৮ নভেম্বর দেশব্যাপী ৩য় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ থানাধীন গড়াগ্রাম ইউনিয়নের পশ্চিম দলিরাম মাঝাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রে সহিংসতার ঘটনায় বিজিবি সদস্য নায়েক রুবেল হোসেন নির্মমভাবে নিহত হন।

তিনি বলেন, এ ঘটনায় ভোট কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার ললিত চন্দ্র রায় বাদী হয়ে গত ৩০ নভেম্বর ৯৫ জন আসামির নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও অনেকের নামে নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেন।

মারুফ জিজ্ঞাসাবাদে জানান, তার নির্বাচনী মূল্যায়ণ অনুযায়ী নির্বাচনে জয়লাভ করতে তার স্থায়ী এলাকার গড়াগ্রাম ইউনিয়নের ভোটকেন্দ্র পশ্চিম দলিরাম মাঝাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রায় সব ভোট প্রয়োজন। যেকোনো মূল্যে তিনি এই কেন্দ্রের প্রায় সব ভোট তার অনূকূলে যেন হয় এজন্য পেশীশক্তি ব্যবহার করবে বলে পরিকল্পনা করে। মারুফ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে থেকেই কেন্দ্র দখল ও প্রয়োজনে হামলা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।

র্যাবের মুখপাত্র জানায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী ভোট চলাকালীন বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে তার পক্ষের আনুমানিক ২০/৩০ জন সমর্থক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ভোটকেন্দ্রে অনাধিকার প্রবেশ করে জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা করে। ভোটকেন্দ্রের কর্তব্যরত পুলিশ সদস্য তাদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিতে চেষ্টা করলে তারা তাদের গালি-গালাজসহ শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করে। পরবর্তীতে প্রিজাইডিং অফিসার উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে মোবাইলে ঘটনা অবহিত করলে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার নির্দেশক্রমে ভোটগ্রহণ সাময়িক স্থগিত করা হয়।

অতিরিক্ত পুলিশ টহল দল ঘটনাস্থলে এসে পরিবেশ স্বাভাবিক করে। এরপর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ভোটগ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা করে ভোট গণনা শুরু করা হয়। কেন্দ্রে মোট ২ হাজার ৯৭১ ভোটের মধ্যে গ্রেফতার প্রার্থীর পক্ষে ২ হাজার ৩৩৬ ভোট ও অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী যথাক্রমে; ৭০টি ও ০৬টি ভোট পায়। এরই মধ্যে অন্য ৮টি কেন্দ্রের ফলাফল বিশ্লেষণে তিনি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর ভোটের তুলনায় সামান্য পিছিয়ে থাকায় সে ফলাফল পরিবর্তনের জন্য (সম্পূর্ণ ভোট তার পক্ষে দেওয়ার জন্য) প্রিজাইডিং অফিসারকে আটকে রেখে চাপ দিতে থাকে।

তিনি আরও বলেন, প্রিজাইডিং অফিসার অপারগতা প্রকাশ করলে মারুফসহ তার প্রায় শতাধিক সমর্থকদের নিয়ে বিভিন্ন ধারালো দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রিজাইডিং অফিসার, অন্যান্য নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি, কেন্দ্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা করে আহত করে।

এসময় নির্বাচনের কাজে ব্যবহৃত সরকারি যানবাহন ও নির্বাচন কেন্দ্রে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। এরপরে রাত সাড়ে ৮টার সময় বিজিবি টহল দল উপস্থিত হলে গ্রেফতার মারুফ হোসেন ও তার সমর্থকরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে বিজিবি সদস্যদের ওপর চড়াও হয়।

র‌্যাবের দেওয়া তথ্য মতে, সংঘর্ষের একপর্যায়ে গুরুতর জখমের ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নায়েক রুবেল ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন এবং আরও অনেকেই আঘাতপ্রাপ্ত হয়। সহিংসতার এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর মামলার প্রধান আসামি মো. মারুফ হোসেন নীলফামারী জেলার জলঢাকায় ও পরবর্তীতে গত ৩০ নভেম্বর থেকে গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত ঢাকার আশুলিয়ায় আত্মগোপনে থাকেন।

এরই ধারাবাহিকতায় র্যাব সদরদপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-৪ এর অভিযানে গতকাল রাতে ঢাকার আশুলিয়া এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিজিবি সদস্য নায়েক রুবেল হোসেনের হত্যাকাণ্ডের এজাহারনামীয় প্রধান আসামি মারুফ হোসেন ওরফে অন্তিককে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার মারুফ ভোটকেন্দ্রে হামলা এবং বিজিবি সদস্য হত্যার ঘটনায় বিভিন্ন তথ্য দেন।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন আরও বলেন, গ্রেফতার মারুফ হোসেনের বাবা মৃত মোসাদ্দেক হোসেন নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় গড়াগ্রাম ইউনিয়নের ১৯ বছর ধরে চেয়ারম্যান ছিলেন। তার বাবা গত ২০১৭ সালে মৃত্যুবরণ করলে; এরপর মারুফ উপ-নির্বাচনে নির্বাচিত হয়।

মারুফের বিরুদ্ধে এর আগে কোনো মামলা ছিল কি-না জানতে চাইলে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, খোঁজ নিয়ে জানা যায় তার নামে কোনো মামলা নেই। তবে তিনি এলাকায় আভিজাত্য বিস্তার করার চেষ্টা করতেন।

গ্রেফতারকৃতের বিরুদ্ধে আইনত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান র‌্যাবের এই কর্মকর্তা।

প্রভাতনিউজ/এবিএস