রাষ্ট্রপতির ইসি গঠন সংলাপ শুরু হবে জাতীয় পার্টিকে দিয়ে

ঢাকা: নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপে বসছেন। আগামী সপ্তাহে এই সংলাপ শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে। ধারাবাহিক এই সংলাপে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হবে।

রাষ্ট্রপতির প্রেসসচিব মো. জয়নাল আবেদীন জানান, ‘রাষ্ট্রপতি একটি, ‘স্বাধীন, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য, শক্তিশালী ও কার্যকর’ একটি নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আগামী রোববার অথবা সোমবারই আলোচনায় বসছেন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে।

তিনি জানান, সংসদে প্রধান বিরোধীদল জাতীয় পার্টির সাথে প্রথম আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৩১টি দলের সাথেই আলোচনা হবে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সংলাপ শেষ করার প্রস্তুতি রয়েছে। এ জন্য একদিনে একাধিক দলের সাথে বৈঠক হতে পারে এবং এটা নিয়ে কাজ করছে বঙ্গভবন।

আবেদীন বলেন, সংলাপের মাঝামাঝি পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হতে পারে সরকারি দল আওয়ামী লীগের সাথে সংলাপ।

সংবিধানে ইসি গঠনে আইন প্রণয়নের কথা থাকলেও কোনো সরকারই সেই পথে হাঁটেনি। সংবিধানের আরেকটি অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে দেয়া ক্ষমতা অনুযায়ী কমিশন গঠিত হয়ে আসছে। সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে সিইসি এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। গত কয়েকটি মেয়াদে রাষ্ট্রপতি ‘সার্চ কমিটি’র সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন।

এর আগে ২০১১ সালে পরলোকগত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান নতুন ইসি গঠনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছিলেন। ওই বছর ২২ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া ওই সংলাপে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নিয়েছিলেন। ওই সংলাপের পর সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে ২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ইসি গঠন করা হয়েছিল।

আগামী বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি বর্তমান ইসির পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এ সময়ের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি নতুন কমিশন গঠন করবেন, যাদের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের ইসির স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিতর্ক হয়েছে। প্রশ্ন তুলেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিকদেরও কেউ কেউ।

বর্তমান প্রধান ছিলেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ছিলেন প্রথম সার্চ কমিটির প্রধান। যেটি পরলোকগত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর করেছিলেন। চার সদস্যের ওই সার্চ কমিটি সিইসি পদের জন্য দু’জন এবং নির্বাচন কমিশনার পদের জন্য ১০ জনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। তাদের মধ্য থেকে সাবেক সচিব কাজী রকিবউদ্দীন আহমদকে সিইসি এবং আবদুল মোবারক, আবু হাফিজ, জাবেদ আলী ও মো. শাহনেওয়াজকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন মো. জিল্লুর রহমান।

বিএনপির সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে ২০১৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর সংলাপ শুরু করেছিলেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। এক মাসে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ মোট ৩১টি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সংলাপ করেন তিনি। দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়ন, নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি এবং দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে ইসি গঠনসহ বিভিন্ন পরামর্শ এসেছিল।

রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ সংলাপ শেষে ২০১৭ সালের ২৫ জানুয়ারি নতুন ইসি সদস্য কারা হবেন, তা খুঁজে বের করার জন্য ছয় সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করেছিলেন। কমিটির সদস্যরা ছিলেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, ড. মোহাম্মদ সাদিক, মাসুদ আহমেদ, অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও অধ্যাপক শিরিন আখতার। এ কমিটিকে দশ কার্যদিবসের মধ্যে সিইসিসহ অন্য কমিশনারদের নাম সুপারিশ করতে বলা হয়েছিল। এই সার্চ কমিটি নিজেদের মধ্যে চার দফা বৈঠক ছাড়াও প্রথমে ১২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং পরে আরও চারজনের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া ৩১টি দলের মধ্যে ২৬টি দলের কাছ থেকে পাঁচটি করে নাম নেন তারা। ১৩০টি নামের মধ্য থেকে ২০টির সংক্ষিপ্ত তালিকা করে সার্চ কমিটি। তারা ২০১৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ১০ জনের নাম রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের কাছে দিয়েছিলেন। সেখান থেকেই রাষ্ট্রপতি সিইসি ও অন্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেন। ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচন কমিশনাররা দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ এবার কোন কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপে বসবেন, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাসদ (ইনু), ওয়ার্কার্স পার্টি, গণফোরাম, বিকল্পধারা ও তরিকত ফেডারেশনের সঙ্গে সংলাপের সম্ভাবনা নিশ্চিত বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়াও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সংলাপের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় পার্টি (জেপি), বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), জাকের পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস্‌? পার্টি (এনপিপি), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, গণফ্রন্ট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট), বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ), জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) ও বাংলাদেশ কংগ্রেস।

প্রভাতনিউজ/এবিএস