‘লকডাউনে’ সরকারি অফিস বন্ধের প্রভাব অর্থনীতিতে

করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলমান বিধিনিষেধের মেয়াদ আবারও বাড়াল সরকার। আগামী ১৬ মে পর্যন্ত বিধিনিষেধের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। করোনার সংক্রমণ মোকাবিলায় জনসমাগম এড়াতে এই বিধিনিষেধ চলছে গত ৫ এপ্রিল থেকে। সরকারের জারিকৃত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ৫ এপ্রিল থেকেই বন্ধ রয়েছে সব সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। তবে আইনশৃঙ্খলা, স্বাস্থ্য বিভাগ, ত্রাণ কার্যক্রমসহ জরুরি সেবাপ্রতিষ্ঠান বিধিনিষেধের আওতামুক্ত। এছাড়া আরো কিছু সরকারি কার্যক্রম চলছে সীমিত পরিসরে। তবে মোটা দাগে বলতে গেলে ৫ এপ্রিল থেকে বন্ধ থাকা সরকারি অফিস আগামী ১৬ মে পর্যন্ত কার্যত বন্ধ থাকছে। সরকারি অফিস টানা এক মাস ১১ দিন বন্ধ থাকায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্তরা বলছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক কিছুই সরাসরি সরকারি দপ্তরসমূহের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে সরকারি দপ্তর বন্ধ থাকায় ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের লেনদেন থাকে সরকারি দপ্তরে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে অনেক প্রতিষ্ঠানের বকেয়া বিলও পাওনা রয়েছে। বিল না পাওয়ায় বেসরকারি কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করতে পারছে না। এছাড়া ব্যাংকিং কার্যক্রমও সীমিত থাকায় সামগ্রিক অর্থনীতির স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুত্ সমস্যাজনিত পরিস্থিতিরও মোকাবেলা করা যাচ্ছে না। নতুন বিনিয়োগ কার্যক্রম তো বন্ধই, বরং আনুষঙ্গিক সেবা কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। ঈদের আগে বেতন-বোনাস দেওয়ার সোচ্ছার দাবি উঠলেও সীমিত ব্যাংকিং কার্যক্রম, ব্যাবসায়িক লেনদেন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় উদ্যোক্তারাও একধরনের অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। এমনিতেই ব্যাংকের অসহযোগিতায় এই করোনাকালে ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তারা ধরাশায়ী। ইতিপূর্বে সরকারঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থও সবাই পায়নি, বরং ব্যাংকগুলো কৌশলে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছে। বন্ধ হওয়ার উপক্রম কিছু ব্যাংকও নিজেদের পরিস্থিতির উন্নতি করেছে। কোনো কোনো ব্যাংক গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে হিসাব সমন্বয় করেছে। কিন্তু এখন আর নতুন করে অর্থায়ন করছে না। ফলে উদ্যোক্তা পুরোপুরি আটকে গেছেন। লকডাউনে সরকারি অফিস বন্ধ থাকায় নীতিনির্ধারকদের দ্বারস্থ হওয়াও সম্ভব হচ্ছে না অনেকের পক্ষে, যা সার্বিক গতিকে একধরনের শ্লথ করে দিয়েছে। করোনার প্রভাব, লকডাউনজনিত এই সংকট থেকে তাড়াতাড়ি উত্তরণের পথ খোঁজা দরকার বলেও বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।

জনস্বাস্থ্য বিষেশজ্ঞদের মতে, করোনার সংক্রমণ থেকে মানুষের জীবন বাঁচাতে ‘লকডাউন’ বা বিধিনিষেধের আপাতত বিকল্প নেই। বিশেষ করে দেশের সব মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার আগ পর্যন্ত জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনে সরকারকে বিধিনিষেধের মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। আর অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে অভিজ্ঞরা বলছেন, জীবন আগে, এর সঙ্গে দ্বিমতের অবকাশ নেই। লকডাউনে সরকারের অনেক ব্যয় কমছে, এটাও ঠিক। তবে পাশাপাশি জীবিকার অপরিহার্যতাও বিবেচনায় নিয়ে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ধরে রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে সরকারি অফিসসমূহ খোলা রাখা-না রাখার বিষয়টি সমন্বয় করা প্রয়োজন।

গতকাল সোমবার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, বর্তমানে বিধিনিষেধ যেভাবে আছে, সেগুলো ১৬ মে পর্যন্ত বলবত্ থাকবে। তবে শহরের ভেতরে বাস বা গণপরিবহন চলাচল করবে, কিন্তু দূরপাল্লার বাস আগের মতোই বন্ধ থাকবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে জেলার মধ্যে গণপরিবহন চলবে আগামী বৃহস্পতিবার থেকে। কিন্তু এক জেলা থেকে আরেক জেলায় গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। এছাড়া ট্রেন ও যাত্রীবাহী নৌযানও বন্ধ থাকবে। যেসব মার্কেটে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানা হবে না, প্রয়োজনে সেসব মার্কেট বন্ধ করে দেওয়া হবে। বিধিনিষেধের মেয়াদ আবারও বৃদ্ধির বিষয়ে আজকালের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি করবে সরকার।

দূরপাল্লার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ বন্ধ থাকার কারণে ঈদে বাড়ি ফেরায় মানুষের ভোগান্তি বাড়বে কি না, জিজ্ঞাসা করা হলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ঈদ তো সম্ভবত ১৪ তারিখে। ঈদে সরকারি ছুটি তো তিন দিন, এর মধ্যে দুই দিন পড়ছে শুক্র ও শনিবার। তিন দিনের বাইরে কোনো ছুটি দেওয়া হবে না। মানুষকে মাস্ক পরাতে সরকার ‘কঠোর অ্যাকশনে’ যাচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘আজ (সোমবার) থেকে পুলিশ ও ?সিটি করপোরেশন এবং প্রশাসন দেশের প্রতিটি মার্কেটে সুপারভাইজ করবে। যদি কোনো মার্কেটে বেশি লোক হয়, তা কন্ট্রোল করা যাবে না, তবে মাস্ক ছাড়া যদি বেশি লোকজন ঘোরাফেরা করে, তাহলে প্রয়োজনে সেসব মার্কেট বন্ধ করে দেব। দোকান মালিক সমিতি এ বিষয়ে সহযোগিতা করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।’

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি রোধে কঠোর বিধিনিষেধের দ্বিতীয় ধাপে ১৪ এপ্রিল থেকে দেশে জরুরি কাজ ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, যা ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ নামে পরিচিতি পায়। এই বিধিনিষেধের মধ্যে জরুরি সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান ছাড়া সরকারি-বেসরকারি অফিস ও গণপরিবহন আগের মতোই বন্ধ আছে। তবে উত্পাদনমুখী শিল্পকারখানা স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ চালাতে পারবে।

শুরুতে লকডাউনে শপিং মলসহ অন্যান্য দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশনা থাকলেও ‘জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনা করে’ গত ২৫ এপ্রিল থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান ও শপিংমল খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সড়ক, নৌ ও রেলপথে দূরপাল্লার যাত্রী বহন বন্ধ থাকলেও বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ইতিমধ্যে ‘অতিঝুঁকিপূর্ণ’ বিবেচিত দেশগুলো বাদে অন্য সব গন্তব্যে ‘কঠোর শর্তসাপেক্ষে’ নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে যাত্রী পরিবহনের অনুমতি দিয়েছে। এছাড়া লকডাউনের মধ্যে ব্যাংকে লেনদেন করা যাচ্ছে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত। সতর্কতার অংশ হিসেবে সীমিত জনবল দিয়ে বিভিন্ন শাখা চালু রেখেছে ব্যাংকগুলো।

মন্ত্রিপরিষদের গতকালের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রোজার ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার আগে সরকারি অফিসসমূহ খুলছে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কারো কারো এত দিন ধারণা ছিল, ৫ মের পর থেকে ঈদের আগে হয়তো সরকারি অফিসমূহ খোলা থাকবে। সেক্ষেত্রে সরকারি অফিসে পাওনা বিলসমূহের কিছু অংশ তুলে হলেও নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস দিতে পারবেন। তবে সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে ঈদের আগে নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের বেতন-বোনাস দিতে পারা-না পারা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন অনেকে। ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, এখানে অর্থের অভাবের বিষয়টি আসছে না। সরকারি অফিস বন্ধ এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম সীমিত থাকায় সঞ্চিত অর্থেরও স্বাভাবিক লেনদেন করা সম্ভব হচ্ছে না।