‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে ঘিরে একটি ন্যাশনাল পার্ক গড়ে তুলা হোক’

মুক্তিযুদ্ধের স্মারক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক কটি রেস্তোরাঁ নির্মাণের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ শুরু হয়েছে সারা দেশে।গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে বা করছে। বিস্তারিত এখনও জানা যায়নি। এর আগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের টি, এস, সি ভবনের সংস্কার নিয়ে কিছু প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল।

৮০ এর দশকে প্রথমবার ওখানে একটি শিশু পার্ক তৈরি করে তৎকালীন বি এন পি সরকার, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের স্থান, পরবর্তীতে পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্মৃতি সাক্ষর বহনকারী ঐতিহ্যের স্বাভাবিকত্বকে বিবর্ণ, পরিবর্তন ও মলিন করার যে নীল নকশার সূচনা করেছিল তা কি আজও এই আওয়ামীলীগ সরকারের সময়েও বহমান? এটির উৎকর্ষতা ও সৌন্দর্য বৃদ্ধিমূলক কোন প্রকার সংযোজন, পরিবর্ধন ও কোন মেগা প্রকল্প সরকার হাতে নিতেই পারে, তবে তা অবশ্যই হতে হবে প্রকাশ্যে। একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ ক্রমে সংশ্লিষ্ট দপ্তর উদ্যোগ নেয়ার আগে, সেটি মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর অনুমোদন ও সংসদে আলোচনার মাধ্যমে করা আবশ্যক বলে আমি মনে করি। কারন সোহরাওয়ার্দি উদ্যান নিছক একটি মাঠ, পার্ক বা উদ্যান নয়। এটির সংগে বাঙ্গালির স্বাধিকার আন্দোলন, ও মুক্তিযুদ্ধ পূর্বক বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা ওতপ্রোতভাবে জড়িত ।

সোহরাওয়ার্দি উদ্যান বলতেই বুঝি এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে পাক বাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়াতে বুঝি। বংগবন্ধুর সেই ভাষনের তালে তালে লক্ষ লক্ষ জনতার যুদ্বে ঝাপিয়ে পড়ার অগ্নিশপথ ও মিছিলে মিছিলে মুখর ঢাকা শহরের দিকে ধেয়ে আসা মুক্তিকামী জনতার ঢেউ ও সম্মিলনকে বুঝি। কবি নির্মেলেন্দু গুন, ও শামসুর রাহমানের স্বাধীনতার কবিতা সমষ্টিকে বুঝি।কবি নজরুলের ‘বলবীর চীর উন্নত শীর ঐ শিখর হিমাদ্রীর’কে বুঝি। রবীঠাকুরের আমার সোনার বাংলা আমি তুমায় ভালোবাসীকে বুঝি।সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বলতেই গনশিল্ল্পী ফকির আলমগীরের গনসংগীত ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে” সেই কালজয়ী গানকে বুঝি, বুঝি ছায়ানটের অগ্নিঝরা কবিতা পাঠ। সোহরাওয়ার্দি উদ্যান মানেই এক সাগর রক্তের বিনিময়।তাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মানেই বাংলাদেশ ও বাঙ্গালীর স্বাধীনতাকে বুঝি।

পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মানেই রমনা বটমূলের বৈশাখী মেলা, বাংগালির প্রানের মেলা, রেসকোর্স মানেই বাংলা একাডেমির বইমেলা, শাহবাগের মুক্তিযুদ্বা চত্বর। টি এস সির হাজারো মুক্তপ্রানের ছুটাছুটি, বাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনের সকল প্রানদেয়া শহীদের স্মৃতিবিজরিত কাব্য কথা মুক্তির গান। দেশের সকল আন্দোলন সংগ্রাম ও চেতনার বাতিঘর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্র শিক্ষক বুদ্বিজীবিদের স্মৃতিবিজরিত তার্থস্হান।

সোহরাওয়ার্দি উদ্যান মানেই ১৯৭১ এর পাকহানাদার বাহিনীর আত্বসমর্পণের সেই মহেন্দ্রক্ষন। বিজয়ের সেই শ্বাশত চেতনা।কিশোর কিশোরির দুর্দান্ত ছুটে চলা, উন্মত্ত প্রেমিক প্রেমিকার মুক্তির লক্ষ্য জীবনের সন্ধানে হাত ধরে হেটে চলা অবিরাম । সোহরাওয়ার্দি উদ্যান মানেই বিপ্লব, প্রতিবাদ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।সোহরাওয়ার্দি উদ্যান মানেই আমার আমাদের প্রেম, স্বাধীনতার জয়গান, মুক্ত বিহংগের মতো উড়ে চলা।সুতরাং যে কোন অশুভ উদ্দেশ্যে একে বিকৃত করার, মলিন করার, যে কোন অপপ্রয়াসকে রুখে দেবে বাংলার দামাল ছাত্রজনতা।

আমেরিকায় যারা বেড়াতে আসেন, তাদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যই থাকে হোয়াইট হাউজ ও তার আশেপাশের স্হাপনা গুলো পরিদর্শন করা। এই পুরো জায়গাটিকে বলা হয় ন্যাশনাল পার্ক। আমি নিজে প্রতিবছর বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশ থেকে বেড়াতে আসা শত শত আপন ও পরিচিতজনদের এটি দেখাতে নিয়ে যাই। পায়ে হেটে ঘুরে ঘুরে দেখে দেখে সারাদিন কেটে যায়। ওয়াশিংটন ডিসির শুধু নয় সারা আমেরিকায় আসা সকল পর্যটক ও বিদেশি অথিতিদের প্রধান আকর্ষনই হলো ওয়াশিংটন ডিসির “ন্যাশনাল মল বা পার্ক” (National Mall/Park). এই মল বা পার্কটির তদারক দেখাশুনার জন্যে ফেডারেল সরকারের আলাদা একটি এজেন্সি আছে যার নাম, department of interior. Washington Monument কে ঘিরে এর চতুর্দিকে আছে, হোয়াইট হাউজ, ন্যাচারাল হিষ্ট্রি ও ইন্টারন্যাশনাল স্পেস মিউজিয়াম, ব্ল্যাক হিষ্ট্রি মিউজিয়াম, থমাস জেফারসন, মার্টিন লুথারকিং, আব্রাহাম লিংকন ও ২য় মহাযুদ্ধ্ মেমোরিয়াল।

এই পুরো পার্কে ছডিয়ে ছিঠিয়ে লাগানো আছে জাপান কর্তৃক গিফ্ট হিসেবে দেয়া হাজারও রং বে রং এর চেরি ফুলের গাছ। শুধু মাত্র চেরি ফুলের মওসুমেই দর্শনার্থী ও টুরিস্টদের থেকে আমেরিকার সরকারের আয় হয় কোটি কোটি ডলার। এসব মেমোরিয়াল, ও মিউজিয়াম দেখতে বা ভিতরে যেতে কোন রকম টিকিট কেনার প্রয়োজন পড়ে না। এদের নিজস্ব কোন আয় নেই। আয়টা হয় ঐ সমস্ত টুরিস্টদের থাকা খাওয়া বাস ট্রেন ও বিমানের সব খরচ পাতি থেকে।

ঢাকা শহরের এই সোহরাওয়ার্দি উদ্যানকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ডিসির এই আদলে একটি ন্যাশনাল পার্ক তৈরি করতে পারে পূর্ত মন্ত্রনালয়। রমনা পার্ক, শাহবাগ,জাতীয় যাদুঘর, টি এস সি, বাংলা একাডেমি, শহীদ মিনার, জাতীয় তিন নেতার মাজার নিয়ে আরও কিছু সৌন্দর্য বর্ধক স্হাপনা তৈরি করা যেতে পারে। এখানে জাতীয় স্মৃতি সৌধ ও বংগবন্ধু মুজিবের প্রতিকী মাজার স্হাপন করে উল্লেখিত প্রতিটি সংস্হার বিল্ডিং কারুকাজ ও সংস্কার করে দৃষ্টি নন্দন করা যেতে পারে।

সড়ক বিভাগের সহায়তায় পুরো এলাকাকে একটি মেইন রিং রোড দিয়ে অন্যান্য ছোট ছোট শাখা রাস্তার সাথে যোগ করে, এর অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করা যেতে পারে।এটি সিটি কর্পোরেশন বা পূর্তমন্ত্রনালয় যৌথভাবে করতে পারে।এতে করে ঢাকা শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধিসহ টুরিস্টদের থেকে ভালো উপার্জনের একটি ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে আমার বিশ্বাস। মাননীয় প্রধান মন্ত্রী এ বিষয়ে একটি সংসদীয় কমিটি করে এর সম্ভাব্যতা যাচাই করার কথা ভাবতে পারেন। এধরনের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান সরকারের কাছে জোর দাবী জানাচ্ছি।