দেশে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর তৃতীয় কারণ স্ট্রোক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর প্রায় দেড় কোটি মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। যাদের মধ্যে প্রায় অর্ধকোটি মৃত্যুবরণ করেন এবং প্রায় অর্ধকোটি মানুষ সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
স্ট্রোকের রোগীর জন্য প্রথম চার ঘণ্টা গোল্ডেন আওয়ার বা অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে দ্রুত সুস্থ হতে পারেন রোগী। তবে স্ট্রোকের চিকিৎসায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় রয়েছে বিশাল ঘাটতি। চট্টগ্রাম ও ঢাকা ছাড়া দেশের আর কোথাও স্ট্রোক সেন্টার নেই। তাই সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে প্রতিবছর হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়।
দেশে স্ট্রোকে আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ব্রেইন স্ট্রোকে মারা গেছেন ৮৫ হাজার ৩৬০ জন, যা আগের বছর (২০১৯ সাল) ছিল ৪৫ হাজার ৫০২ জন। চিকিৎসকদের মতে, ডায়াবেটিসের রোগীর স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি দেড় থেকে দুই গুণ বেশি হয়ে প্রায় ৮৫ হাজার ৩৬০ জনে গিয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশে চট্টগ্রামে এবং ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ও জাতীয় নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে স্ট্রোক সেন্টার আছে। এছাড়া বেসরকারিভাবে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতাল, আসগর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ল্যাবএইড ও সিলেটের মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে স্ট্রোকের সেবা চালু রয়েছে।
সরজমিনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, দেশের সবচেয়ে বড় এই চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিদিন ৫০-৬০ জন স্ট্রোক রোগী ভর্তি হন। তবে বিশেষায়িত স্ট্রোক সেন্টার নেই। এ কারণে নিউরোসার্জারি বিভাগে অন্য রোগীদের সঙ্গে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজমুল হক বলেন, আমরা ঢাকা মেডিকেলের ভবন বৃদ্ধি করে ২০ শয্যার একটি স্ট্রোক ইউনিট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি অনেক আগেই। এরই মধ্যে অর্থ বরাদ্দ, অবকাঠামোসহ সবকিছুই মোটামুটি চূড়ান্ত। টেন্ডার হলে আশা করছি দুবছরের মধ্যেই শুরু করা যাবে।
হাসপাতালটির নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অসিত চন্দ্ৰ সরকার বলেন, আমাদের জনসচেতনতা ও দ্রুত চিকিৎসা করার কথা বললেও এখনো ভালোভাবে চিকিৎসা দেওয়ার মতো আমাদের সক্ষমতা অর্জন হয়নি। প্রতিনিয়ত এ হাসপাতালে এত রোগী আসেন, চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। বারান্দায়, সিঁড়িতে অসংখ্য রোগী শুয়ে আছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্ট্রোকের। উন্নত দেশে স্ট্রোক করলে হেলিকপ্টারে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়। আর আমাদের দেশে অন্তত ৪ ঘণ্টার মাঝে চিকিৎসা নেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাপী স্ট্রোকের এমন পরিস্থিতিতে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শনিবার (২৯ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য- ‘না করলে সময়ক্ষেপণ, স্ট্রোক হলেও বাঁচবে জীবন’। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিশ্ব স্ট্রোক দিবস পালন করা হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে র্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
উন্নত বিশ্বের তুলনায় নিম্ন আয়ের দেশে স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। এই ঝুঁকি নিয়মিত বেড়েই যাচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এটা ৮০ শতাংশ বাড়তে পারে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের ২০১৮ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রতি হাজারে স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন ১১ দশমিক ৩৯ জন মানুষ। প্রায় ২০ লাখ স্ট্রোকের রোগী রয়েছে বাংলাদেশে। স্ট্রোকের ঝুঁকি ৬০ বছরের বেশি মানুষের মধ্যে ৭ গুণ বেশি। নারীর চেয়ে পুরুষের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি দ্বিগুণ। স্ট্রোকের প্রকোপ শহরের চেয়ে গ্রামে কিছুটা বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্রোক হলো মস্তিষ্কে হঠাৎ রক্ত সরবরাহে বাধা সৃষ্ট হওয়া। আর স্ট্রোকের প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপন। যে কারণে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বেই তরুণদের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ৫০ ভাগ স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, ধূমপান, নিয়মিত মদ্যপান, কায়িক পরিশ্রম না করা, ফাস্টফুড বা জাঙ্ক ফুড গ্রহণও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। মানুষের অনিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপনে বাড়ছে স্ট্রোকের ঝুঁকি। স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগী চেনার উপায় মুখ বেকে যাওয়া, হাত একদিকে ঝুলে যাবে বা শক্তি কম পাবে, চোখে ঝাপসা দেখা এবং রোগীর কথা জড়িয়ে যাবে। তীব্র মাথাব্যথা এবং রোগী হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে পারে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. রবিউল করিম বলেন, স্ট্রোক এমন একটি রোগ যেটি সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণার শেষ নেই। স্ট্রোক কোন ধরনের রোগ এবং এ রোগের জন্য কোন বিশেষজ্ঞকে দেখাতে হবে, এতটুকু না জানার কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেক রোগী। ভ্রান্ত ধারণা বা প্রচলিত মিথ থেকে বের হয়ে আসতে পারলে স্ট্রোক আক্রান্তদের পুনর্বাসন নিশ্চিতের পাশাপাশি মৃত্যুর হার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব
তিনি বলেন, সময়ক্ষেপণ অনেক কারণেই হয়ে থাকে। কেউ হয়তো বুঝতে পারেন না, কেউ অনেক দূরে থাকেন। আবার কেউ হয়তো ডাক্তার পাচ্ছেন না বা চিকিৎসায় তার লম্বা লাইন। বাংলাদেশসহ কিছু অল্পশিক্ষিত দেশে এটা বেশি হচ্ছে। সেটা হলো কিছু ভুল ধারণা, যেটাকে বলা হয় মিথ। এই মিথগুলো বহুল প্রচলিত এবং মানুষের মনে অনেক গভীরভাবে পতিত। এই মিথ দূর করতে গণমাধ্যম ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে।





