লিওনেল মেসিকে পুরোপুরি থামানোর কোনো নিশ্চিত পদ্ধতি ফুটবলে এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তাকে যতটা সম্ভব বল থেকে দূরে রাখা, প্রিয় জায়গাগুলো সংকুচিত করা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কমিয়ে দেওয়াই প্রতিপক্ষের সর্বোচ্চ চেষ্টা হতে পারে। এই কাজটি সবচেয়ে সফলভাবে করতে পেরেছিল জার্মানি, ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে।
বারো বছর পর আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে সেই ম্যাচের কৌশলই ফিরে আসছে আলোচনায়। এবার প্রতিপক্ষ স্পেন। আর সেদিন মেসিকে থামানোর মূল কারিগর বাস্তিয়ান শোয়াইনস্টাইগারের সেই দায়িত্ব পালনের প্রধান দাবিদার রদ্রি।
বাংলাদেশ সময় সোমবার রাত ১টায় নিউ জার্সিতে বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। আট গোল ও চার গোলে সহায়তা করা মেসি আর্জেন্টিনার ১৯ গোলের ১২টিতেই সরাসরি জড়িত। ফলে স্পেনের কৌশল ঠিক করার সময় প্রথম প্রশ্নটিই হবে, মেসিকে বিপজ্জনক জায়গায় বল পাওয়া থেকে বিরত রাখা যাবে কীভাবে। প্রশ্নটার মতো উত্তরটাও কঠিন।
একজনকে দিয়ে মেসিকে অনুসরণ নয়
মেসিকে থামাতে গিয়ে অনেক দলের প্রথম ভুল হয় একজন ফুটবলারকে তার পেছনে লাগিয়ে দেওয়া। মেসি তখন নিজের স্বাভাবিক জায়গা ছেড়ে সরে গিয়ে সেই রক্ষককে অবস্থানচ্যুত করেন। তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গায় ঢুকে পড়েন অন্য আর্জেন্টাইনরা।
স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, মেসির জন্য আলাদা কোনো ব্যক্তিগত পাহারাদার রাখবেন না। এর পেছনে তার নিজের একটি তিক্ত অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
সেভিয়ার বয়সভিত্তিক দলের কোচ থাকার সময় কিশোর মেসির জন্য একজনকে আলাদা দায়িত্ব দিয়েছিলেন দে লা ফুয়েন্তে। ৭০ মিনিট পর্যন্ত গোলশূন্য থাকার পর হলুদ কার্ড দেখা সেই পাহারাদারকে তুলে নেন তিনি। পরের ১৫ মিনিটে চার গোল করেন মেসি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার একজনকে দিয়ে মেসিকে অনুসরণের পরিকল্পনা বাদ দিয়েছেন স্পেন কোচ। বরং পুরো দলকে বিশেষভাবে সতর্ক রাখবেন তিনি।
জার্মানির ‘চলন্ত খাঁচা’
২০১৪ সালের ফাইনালে হোয়াকিম ল্যোভের জার্মানি মেসির পেছনে একজনকে ছোটায়নি। মেসি মাঠের যে অঞ্চলে গেছেন, সেখানকার সবচেয়ে কাছের জার্মান ফুটবলার তার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন। একই সময়ে আরও দুজন তার সামনে ও পাশের পাসের পথ বন্ধ করেছেন।
মেসি এক অঞ্চল ছেড়ে অন্য জায়গায় গেলে তাকে অনুসরণ করেননি আগের ডিফেন্ডার। নতুন অঞ্চলের খেলোয়াড় তার দায়িত্ব নিয়েছেন। এর ফলে মেসির চারপাশে তৈরি হয়েছিল জায়গা বদলাতে থাকা একটি চলন্ত খাঁচা।
সেই কৌশলের কেন্দ্রে ছিলেন শোয়াইনস্টাইগার। জার্মান ডিফেন্সের সামনে থেকে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের সঙ্গে মেসির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা করেন তিনি। মেসি ভেতরের দিকে ঢুকলেই জায়গা ছোট করে দেন। বল পেয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই তার ওপর চাপ আসে।
বেনেডিক্ট হ্যোভেডেস পুরো আসরেই জার্মানির বাঁ প্রান্তের ডিফেন্ডার ছিলেন। স্বাভাবিকভাবে তিনি কেন্দ্রে খেললেও তার শারীরিক শক্তি ও রক্ষণাত্মক মানসিকতা ফাইনালে বাড়তি সুবিধা দিয়েছিল। হ্যোভেডেস ও ম্যাটস হামেলস ভেতরের পথ বন্ধ রেখে মেসিকে বাইরের দিকে এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বল ডান পায়ের ওপর খেলতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন।
জার্মানি অবশ্য মেসিকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য করতে পারেনি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ভালো একটি সুযোগ পেয়েছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক, কিন্তু তার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। আর্জেন্টিনাও ম্যাচে একাধিক সুযোগ তৈরি করেছিল। তবে মেসিকে নিয়মিত বিপজ্জনক জায়গায় বল পাওয়া থেকে বিরত রাখতে পেরেছিল জার্মানি। অতিরিক্ত সময়ে মারিও গ্যোটসের গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে শিরোপা নেয় তারা।
স্পেনের শোয়াইনস্টাইগার হতে হবে রদ্রিকে
জার্মানির সেই পরিকল্পনা অনুসরণ করতে হলে স্পেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হবেন রদ্রি। মেসির পেছনে ছোটার পরিবর্তে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠ থেকে তার কাছে যাওয়ার পথগুলো বন্ধ রাখতে হবে স্পেন অধিনায়ককে।
লিয়ান্দ্রো পারেদেস, এনজো ফার্নান্দেজ কিংবা অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের কাছ থেকে মেসি যখন দুই রক্ষণসারির মধ্যবর্তী জায়গায় বল পান, তখনই সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন। রদ্রির কাজ হবে সেই পাস হওয়ার আগেই পথটি বুঝে নেওয়া। মেসিকে অনুসরণ করতে গিয়ে নিজের জায়গা ছেড়ে দিলে বরং হুলিয়ান আলভারেজ কিংবা অন্য কোনো আর্জেন্টাইন সেই ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করতে পারেন।
এবারের বিশ্বকাপে রদ্রির ৬৪৮টি সফল পাস সব খেলোয়াড়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। পাসে তার সফলতার হার ৯৩ শতাংশ। বল ছাড়া প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামানোর পাশাপাশি স্পেনের খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও তার। ফিফার পরিসংখ্যান বলছে, সাত ম্যাচে মাত্র একটি গোল খাওয়া স্পেন প্রতিপক্ষের কাছ থেকে জোর করে ৩৪৩ বার বলের দখল কেড়ে নিয়েছে, যা ফাইনালিস্ট দুই দলের মধ্যে সর্বোচ্চ।
scotland was the last team to beat spain
স্পেনকে হারাতে স্কটল্যান্ডের কাছ থেকে যা শিখতে পারে আর্জেন্টিনা
মেসিকে থামানোর সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হতে পারে তার পায়ে বলই না যেতে দেওয়া। স্পেন যত বেশি সময় বলের দখল ধরে রাখতে পারবে, মেসিকে তত বেশি নিজের অর্ধে নেমে বল খুঁজতে হবে। তাতে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগে তার প্রভাব কমবে।
তবে বলের দখল নিয়ে স্পেনের একচ্ছত্র আধিপত্য নিশ্চিত নয়। এবারের বিশ্বকাপে দল হিসেবে স্পেনের চেয়েও বেশি সফল পাস দিয়েছে আর্জেন্টিনা। ফলে রদ্রিদের শুধু বল ধরে রাখলেই হবে না, হারানোর পর দ্রুত নিজেদের অবস্থানে ফিরে মেসির দিকে যাওয়া প্রথম পাসটিও বন্ধ করতে হবে।
অতিরিক্ত মনোযোগেই লুকিয়ে বিপদ
২০১৪ সালের পরিকল্পনা হুবহু অনুসরণ করলেই যে সাফল্য আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তখনকার মেসি ও বর্তমান মেসির খেলার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। ৩৯ বছর বয়সে তিনি এখন কম দৌড়ান, কিন্তু কোন মুহূর্তে কোথায় গেলে ম্যাচ বদলানো যাবে, সেটি আরও নিখুঁতভাবে বোঝেন।
বর্তমান আর্জেন্টিনাও শুধু মেসিনির্ভর দল নয়। এনজো, ম্যাক অ্যালিস্টার, হুলিয়ান ও লাউতারো মার্তিনেজের মতো ফুটবলাররা অতিরিক্ত জায়গা পেলে স্পেনকে শাস্তি দিতে পারেন। মেসিকে ঘিরে তিনজন জড়ো হলেই অন্য কোথাও একজন আর্জেন্টাইন ফাঁকা হয়ে যাবেন।
তাই জার্মানির কাছ থেকে স্পেনের শেখার বিষয় কোনো নির্দিষ্ট ছক নয়, দলগত শৃঙ্খলা। মেসিকে একজন ফুটবলার থামাতে পারবেন না। তাকে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে পুরো দলকে একসঙ্গে। রদ্রি যদি শোয়াইনস্টাইগারের মতো মাঝমাঠের দরজা বন্ধ রাখতে পারেন, ডিফেন্স যদি দূরত্ব ঠিক রাখে এবং বল হারানোর পর স্পেন যদি দ্রুত গুছিয়ে নিতে পারে, তাহলে মেসির প্রভাব কমানো সম্ভব।
কিন্তু পরিকল্পনাটি ৮৯ মিনিট নিখুঁতভাবে কার্যকর হলেও একটি মুহূর্তের ভুলই সব হিসাব বদলে দিতে পারে। কারণ প্রতিপক্ষের নাম লিওনেল মেসি।





