বদলে যাচ্ছে কৃষকদের ভাগ্য?

বাংলাদেশ যার হৃদয়ে লুকিয়ে আছে কৃষি, আর যার মেহনতি মানুষের ঘামে গড়ে ওঠে আমাদের খাদ্যের নিরাপত্তা। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বব্যাপী খাদ্যের যে সংকট আর জলবায়ু পরিবর্তনের যে হুমকি, তার মুখে দাঁড়িয়ে এবার এক ঐতিহাসিক মহা-পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করতে কৃষিখাতে অভূতপূর্ব সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। এতদিন যে কৃষিকে আমরা কেবল পেট চালানোর একটা মাধ্যম বলে ভাবতাম, সেই কৃষিকে এবার প্রযুক্তিনির্ভর, আধুনিক এবং পুরোপুরি একটি লাভজনক বাণিজ্যিক খাতে রূপান্তর করার বিশাল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আগামী কয়েক অর্থবছর জুড়ে ধাপে ধাপে হাজার হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ বৃদ্ধি, আধুনিক যন্ত্রপাতির সরবরাহ, সহনশীল জাতের বীজ উদ্ভাবন এবং রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য এক ধাক্কায় ৩ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ফান্ড কী নেই এই মাস্টারপ্ল্যানে? সরকারের এই মেগা পরিকল্পনা আসলে কী, এর পেছনের অংকটা কী, আর আমাদের প্রান্তিক কৃষকদের জীবনে এর প্রভাব ঠিক কতটা পড়তে যাচ্ছে।

পরিকল্পনা বিভাগের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি (ADP)-র তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার কৃষিকে নতুন করে সাজাতে কয়েক বছরের একটি সুনির্দিষ্ট নীলকশ তৈরি করেছে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই কৃষি খাতে প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, এর বাইরে থোক হিসেবে রয়েছে আরও ২ হাজার ৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। আর বিশেষ প্রয়োজনে সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য আরও ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

আর আগামী বছরগুলোর হিসাবটা শুনলে আপনি আরও অবাক হবেন। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে এই বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রাক্কলন করা হয়েছে ৯ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে তা ছাড়িয়ে যাবে ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে এই বিনিয়োগের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ১১ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এত হাজার কোটি টাকা কোন কোন জায়গায় খরচ হবে? সরকার জানিয়েছে, এই বিশাল অর্থের বড় একটা অংশ ব্যয় হবে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে।

বর্তমানে গ্রামগঞ্জে কৃষি শ্রমিকের যে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলা করতে এবং শস্য রোপণ থেকে কাটা পর্যন্ত সময় ও খরচ বাঁচাতে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার এবং সেচকাজে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হবে।

এই বিশাল বাজেটের পাশাপাশি সম্প্রতি রাজশাহী অঞ্চলে ঘটেছে এক বৈপ্লবিক ঘটনা রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি উদ্যোক্তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ দূর করতে সরকার এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিয়েছে।

সম্প্রতি রাজশাহীতে আয়োজিত ‘রিজিওনাল কনফারেন্স অন এগ্রো প্রসেসিং’ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এক বিশাল সুখবর দিয়ে জানিয়েছেন, রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন তহবিল গঠন করা হয়েছে!

চিন্তা করে দেখুন, অতীতের কোনো সরকারই নাকি রাজশাহী অঞ্চলের কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য এমন বিশাল একক উদ্যোগ নেয়নি। আর এই ৩ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে আমাদের তরুণ ও নতুন কৃষি উদ্যোক্তারা মাত্র ৫ থেকে ৯ শতাংশ নামমাত্র সুদে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পাবেন।

এর মূল উদ্দেশ্য কী? আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায়, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ অবকাঠামো বা প্রসেসিং প্ল্যান্ট না থাকায় কোটি কোটি টাকার ফলমূল ও শাকসবজি পচে নষ্ট হয়ে যায়। কৃষকরা পানির দামে তা বিক্রি করতে বাধ্য হন। কিন্তু এই ৩ হাজার কোটি টাকার ফান্ডের মাধ্যমে রাজশাহীতে গড়ে উঠবে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, হিমাগার এবং উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা। ফলে আম, টমেটো, আলু সহ স্থানীয় কৃষি শস্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করার নতুন দুয়ার খুলে যাবে!

তবে, চকচক করলেই কিন্তু সোনা হয় না। হাজার হাজার কোটি টাকার এই মহাপরিকল্পনা কি আসলেই মাঠপর্যায়ের একজন সাধারণ কৃষকের পকেটে টাকা এনে দিতে পারবে? এখানেই আসছে বড় প্রশ্ন।

দেশের খ্যাতিমান কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এ সাত্তার মণ্ডল সরকারের এই উদ্যোগকে দারুণ ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও, একটি বড় সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, শুধু বাজেটে বরাদ্দ বাড়ালেই কৃষকের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে না। আসল খেলাটা লুকিয়ে আছে প্রকল্প বাস্তবায়নের মানের ওপর।

ড. সাত্তার মণ্ডল আরও মনে করিয়ে দেন, আমাদের দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের প্রধান সংকট হলো নগদ অর্থের প্রবাহ বা Cash Flow। জমি লিজ নেওয়া থেকে শুরু করে সার, বীজ, কীটনাশক কেনা প্রতিটি ধাপে একজন কৃষককে নগদ টাকা পকেট থেকে গুনতে হয়। আর ঠিক এই জায়গাতেই মহাজন বা মধ্যস্বত্বভোগীরা তাদের শোষণের জাল বিছায়।

তাই তাঁর পরামর্শ হলো, শুধু প্রকল্পের সংখ্যা না বাড়িয়ে, এমন সব প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে যা সরাসরি মাঠপর্যায়ের প্রান্তিক কৃষকের হাতের নগদ টাকার সংকট দূর করবে এবং তাদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করবে। কৃষকের ফসল যদি তিনি ন্যায্য দামে বিক্রিই না করতে পারেন, তবে এই হাজার কোটি টাকার যান্ত্রিকীকরণের সুফল কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।