শিক্ষকতা ছেড়ে তৃণমূল থেকে রাজনীতি শুরু করেন তিনি। এরপর নিজের এলাকা ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র হন। সেই মেয়র থেকে শুরু করে নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে এমপি, মন্ত্রী- আজ বঙ্গভবনের পথে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী। তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়াটা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। ২০ আগস্ট নির্বাচনের পরই শপথ নেবেন তিনি। বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নের খবরে মির্জা ফখরুলের নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে খুশির বন্যা বইছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে দলীয় সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীরা মিষ্টি বিতরণ করছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
মির্জা ফখরুল ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-৩ নির্বাচনি এলাকা থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
বিএনপির মহাসচিব : বাংলাদেশের স্বচ্ছ ইমেজের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে তিনি ২০১১ সালের ২০ মার্চ থেকে পাঁচ বছর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত করা হয়। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল তাঁর নিজ জেলা ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে নির্বাচিত হন। এই পদটিতে এর আগে তারেক রহমান ছিলেন। ওই সম্মেলনে তারেক রহমান দলের ভাইস চেয়ারম্যানের পদ লাভ করেন।
২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মৃত্যুবরণ করার পর দলটির তৎকালীন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা করেন। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলটির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে মির্জা ফখরুল পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে নির্বাচিত হন।
দলের দুঃসময়ের কান্ডারি : মির্জা ফখরুলকে দলের দুঃসময়ের কান্ডারি বলা হয়। তাঁর দায়িত্বকাল ছিল চ্যালেঞ্জ এবং কণ্টকাপূর্ণ। বিশেষ করে ১/১১ এবং গত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দলের চরম দুঃসময়ে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে দলের হাল ধরেন। ২০১৮ সালে দলের তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারান্তরিন হন এবং বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নির্বাসনে থাকতে বাধ্য করাকালে মির্জা ফখরুল দলীয় মুখপাত্র ও মহাসচিব হিসেবে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেন। দলের দুই শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতির সময় শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে দলের নেতৃত্ব দেন।
ছাত্র আন্দোলন : ’৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে (ইপিএসইউ) যোগদানের মাধ্যমে তাঁর রাজনীতিতে পদার্পণ ঘটে। ১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি শিক্ষা ক্যাডারে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র থাকাকালীন তাঁর রাজনৈতিক অভিযান শুরু করেন। সেই সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে (ইপিএসইউ) যোগদান করেন। তিনি সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএম হল শাখার মহাসচিব নির্বাচিত হন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে উঠে আসেন এবং ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণ অভ্যুত্থান তুঙ্গে ওঠার সময় সংগঠনের মর্যাদাপূর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হন। রাজনৈতিক কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার এবং কারাগারে পাঠানো হয়।
জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ : মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন এবং সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে তিনি নিরপেক্ষ প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে দেশব্যাপী এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুলকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়।
প্রাথমিক জীবন : ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণকারী ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করার পর মির্জা ফখরুল ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (শিক্ষা ক্যাডারের) সদস্য হিসেবে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে সফল শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অন্য সরকারি দায়িত্বের মধ্যে তিনি বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপপরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনে কাজ করেন। তিনি ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও কাজ করেন। ১৯৮২ সালে এস এ বারী পদত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবন : মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ব্যক্তিগত জীবনে রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং বর্তমানে ঢাকায় একটি বিমা কোম্পানিতে কর্মরত। এই দম্পতির দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ এবং মির্জা সাফারুহ। শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন এবং এই প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি বর্তমানে ঢাকার একটি স্বনামধন্য স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমিন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি পদে আছেন। তিনিও ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র ছিলেন। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ছিলেন। ঠাকুরগাঁও নির্বাচনি এলাকা থেকে বেশ কয়েকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের কৃষিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন বিএনপির রাজনীতিবিদ, যিনি ভূমিমন্ত্রী (১৯৭৮-৭৯), আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী (১৯৯১-৯৬) এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার (১৯৭৯-৮২) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মির্জা হাফিজ ১৯৭৯ সালে ঢাকার একটি নির্বাচনি এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
মির্জা ফখরুলের আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালের এপ্রিলে গঠিত মুজিবনগর প্রবাস সরকারে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ সুবিধা তদারকির জন্য নবগঠিত যুব শিবির অধিদপ্তরের প্রধান হিসেবে তাঁকে মনোনীত করা হয়েছিল।





