বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, তারুণ্য ও সুস্থ জীবনধারাকে একসূত্রে গেঁথে রাজধানীর হাতিরঝিলে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘নকশী কাঁথা ম্যারাথন’। নকশী কাঁথার নান্দনিকতা ও বাঙালির লোকজ ঐতিহ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এ ম্যারাথনে অংশ নেন প্রায় দেড় হাজার দৌড়বিদ।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ভোর ৫টায় শুরু হওয়া আয়োজনে ২, ৫ ও ১৫ কিলোমিটার—এই তিন ক্যাটাগরিতে অংশ নেন বিভিন্ন বয়সী দৌড়বিদ। ম্যারাথনের আয়োজন করে এনএসইউ রানার্স। টাইটেল স্পন্সর ছিল দেশের ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড টুয়েলভ।
ভোরের আলো ফোটার আগেই হাতিরঝিলে জড়ো হতে শুরু করেন দৌড়বিদরা। নির্ধারিত সময়ে দৌড় শুরু হলে হাতিরঝিলের সড়কজুড়ে তৈরি হয় প্রাণবন্ত পরিবেশ। বিভিন্ন বয়সী মানুষের পাশাপাশি তরুণদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
আয়োজকদের মতে, ম্যারাথনের মাধ্যমে একদিকে সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপনের বার্তা দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে নকশী কাঁথার মতো বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্পরীতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
নকশী কাঁথা আয়োজনের মূল ভাবনায়
ম্যারাথনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নকশী কাঁথাকে থিম হিসেবে গ্রহণ করা। বাংলার লোকজ সংস্কৃতির পরিচিত এই শিল্পকর্মের নকশা ও সেলাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের জীবন, প্রকৃতি, অনুভূতি ও সংস্কৃতির নানা গল্প।
গ্রামীণ বাংলার নারীদের সৃজনশীল হাতে তৈরি নকশী কাঁথা দীর্ঘদিন ধরে দেশের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই ঐতিহ্যকে আধুনিক ক্রীড়া আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করে ভিন্ন পরিসরে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয় এ ম্যারাথনে।
ম্যারাথনের টাইটেল স্পন্সর টুয়েলভের সঙ্গে নকশী কাঁথার সম্পৃক্ততার পেছনেও রয়েছে ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতাকে সামনে আনার ভাবনা। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ফ্যাশনকে শুধু পোশাক হিসেবে নয়, বরং একটি দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতার বাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই ভাবনা থেকেই তাদের বিভিন্ন ফ্যাশন সংগ্রহে নকশী কাঁথার নকশা ও শিল্পভাবনা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে নকশী কাঁথার সঙ্গে যুক্ত কারুশিল্পী ও নকশাশিল্পীদের সৃজনশীলতা ও অবদানকে সম্মান জানানোও ছিল এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
দৌড় শেষে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা
প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। তবে অংশগ্রহণকারীদের কাছে আয়োজনটি শুধু প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। শরীরচর্চা ও সক্রিয় জীবনধারার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করার সুযোগ হিসেবেও তারা ম্যারাথনটিকে দেখেছেন।
ম্যারাথনের মূল পর্ব হাতিরঝিলজুড়ে অনুষ্ঠিত হলেও সমাপনী আয়োজন করা হয় হাতিরঝিল অ্যাম্ফিথিয়েটারে। সেখানে নকশী কাঁথাকে কেন্দ্র করে এনএসইউ রানার্সের সদস্যরা পরিবেশন করেন বর্ণাঢ্য ফ্ল্যাশমব। নৃত্য ও সংগীতের সমন্বয়ে ঐতিহ্যবাহী নকশী কাঁথার ভাবনাকে সমকালীন পরিবেশনার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
মেসির বিশাল মুরাল
সমাপনী অনুষ্ঠানে ছিল আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ। শিল্পী মিশু সাব্বিরের নির্মিত ফুটবল তারকা লিওনেল মেসির বিশাল আকৃতির একটি মুরাল প্রদর্শন করা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, শিল্পকর্মটি বর্তমানে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে।
বিশাল আকৃতির মুরালটি অনুষ্ঠানস্থলে অংশগ্রহণকারী ও দর্শনার্থীদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করে। একজন দেশীয় শিল্পীর সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একজন ক্রীড়া তারকার প্রতিকৃতি তুলে ধরার উদ্যোগটি আয়োজনটিতে আলাদা মাত্রা যোগ করে।
ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন
অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, ‘নকশী কাঁথা ম্যারাথন’ শুধু একটি দৌড় প্রতিযোগিতা নয়; এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।
তাদের মতে, খেলাধুলা ও শরীরচর্চার মতো আধুনিক জীবনযাপনের অনুষঙ্গের সঙ্গে দেশের ঐতিহ্যকে যুক্ত করা গেলে তরুণদের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে এ ধরনের আয়োজন বাংলাদেশের লোকজ শিল্প ও সৃজনশীলতাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
আয়োজকদের ভাষ্য, বর্তমান সময়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রায় শরীরচর্চা ও মানসিক সুস্থতার গুরুত্ব যেমন বাড়ছে, তেমনি বিশ্বায়নের প্রভাবে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। সেই দুই বিষয়কে একই আয়োজনের মাধ্যমে সামনে আনার চেষ্টা করা হয়েছে ‘নকশী কাঁথা ম্যারাথন’-এ।
টুয়েলভ জানিয়েছে, দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও সুস্থ জীবনধারাকে উৎসাহিত করে এমন উদ্যোগের সঙ্গে ভবিষ্যতেও সম্পৃক্ত থাকতে চায় তারা। দেশীয় শিল্প ও ফ্যাশনের বৈচিত্র্যকে বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করার ক্ষেত্রেও কাজ করার প্রত্যয় জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
হাতিরঝিলের ভোরের দৌড় থেকে শুরু করে অ্যাম্ফিথিয়েটারের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা—সব মিলিয়ে ‘নকশী কাঁথা ম্যারাথন’ হয়ে উঠেছিল ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক ব্যতিক্রমী সম্মিলন। প্রায় দেড় হাজার দৌড়বিদের অংশগ্রহণ, নকশী কাঁথার থিম, বর্ণাঢ্য ফ্ল্যাশমব ও মেসির বিশাল মুরাল—সবকিছু মিলিয়ে আয়োজনটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও তারুণ্যের সম্মিলিত উদযাপনে পরিণত হয়।





