৯/১১ জাদুঘর: যে সত্য দেখাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র

নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরোর সত্তর ফুট গভীরে দাঁড়িয়ে আজও যেন থামেনি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের চিৎকার। ধ্বংসপ্রাপ্ত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সেই স্থানে প্রতিষ্ঠিত ‘৯/১১ মেমোরিয়াল অ্যান্ড মিউজিয়াম’ প্রায় পুরো ঘটনার স্মৃতিকেই অতি সতর্কতার সঙ্গে ধরে রেখেছে। কিন্তু সেই স্মৃতির অবয়বে এক বিশাল শূন্যতা রয়ে গেছে। এক চতুর্থাংশ শতাব্দী ধরে এই মিউজিয়াম আমেরিকানদের নিজস্ব ট্রমাকে যত্নে সংরক্ষণ করে রাখলেও যে ভূরাজনৈতিক পটভূমিতে ওই হামলা ঘটেছিল এবং হামলার পর বিশ্বব্যাপী যে তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার কোনো বাস্তব চিত্র তুলে ধরেনি।

মিউজিয়ামটিতে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে পোড়া ফায়ার ট্রাক, দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া স্টিলের বিম, অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের ব্যবহৃত হেলমেট, ক্ষতিগ্রস্তদের হাতঘড়ি কিংবা অপহৃত বিমানগুলোর যাত্রীদের রেখে যাওয়া শেষ বার্তা। একাধিক কোণ থেকে টাওয়ারে বিমান হামলার চিত্র প্রদর্শিত হয়, লাউডস্পিকারে বেজে ওঠে বাঁচার আশা ছেড়ে দেওয়া অসহায় যাত্রীদের কণ্ঠস্বর। ১ লাখ ১০ হাজার বর্গফুটের বিশাল এই স্থানে সংগৃহীত ৮৩ হাজারের বেশি স্মারক দর্শককে বারবার ঘটনার দিনের সেই বীভৎসতার মধ্যে ফেরত পাঠায়। এতে ঘটনার ধারাবাহিক ঐতিহাসিক ক্রমানুসারে সাজানোর চেয়ে বরং এমন এক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যাতে দর্শক মানসিকভাবে সেই ট্রমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শ্বাসরুদ্ধকর এক অভিজ্ঞতা পান। মিউজিয়ামের ভেতরের তথ্য বিবরণী ও ভিডিও চিত্রগুলো ঘটনার আকস্মিকতা ও ভয়াবহতাকে জীবন্ত করে রাখলেও এর পেছনের প্রকৃত কারণ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব বৈশ্বিক নীতিকে পুরোপুরি আড়াল করে রাখা হয়েছে।

আল-কায়েদার উত্থান ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্ণনায় মিউজিয়ামটির ভূমিকা বেশ সুবিধাবাদী। বিশ্বব্যাপী ইসলামপন্থী উগ্রবাদ মোকাবিলার যে বয়ান এতে দেখানো হয়েছে, সেখানে স্নায়যুদ্ধকালীন আফগান বিদ্রোহীদের যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ ও অস্ত্র সহায়তার বিষয়টিকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। পাকিস্তান হয়ে বৈশ্বিক জঙ্গিবাদের উত্থানে তৎকালীন মার্কিন নীতির ভূমিকার দায় না নিয়ে পুরো বিষয়টিকে কেবল ধর্মীয় মতাদর্শিক সংঘাত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে সংস্থাটি প্রকারান্তরে ইসলামোফোবিয়ার এক প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।

সবচেয়ে বড় উপেক্ষার বিষয় হলো ১১ সেপ্টেম্বরের পরবর্তী দুই দশকের চিত্র। ৯/১১-এর জবাবে আমেরিকা যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তাতে বিশ্বজুড়ে প্রায় দশ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়েছে। আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন হামলায় নিহত ও বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ মানুষের কোনো নাম, মুখ বা স্বীকৃতি এই মিউজিয়ামে নেই। অধিকন্তু, ঘটনার পর আমেরিকান সমাজে তৈরি হওয়া ব্যাপক নজরদারি, মুসলিমদের ওপর হয়রানি, এবং গুয়ান্তানামো বে কিংবা আবু গারিবের মতো জায়গায় পরিচালিত অমানুষিক নির্যাতনের মতো কালো অধ্যায়গুলো এখানে অনুপস্থিত। এমনকি মিউজিয়ামে প্রবেশের নিরাপত্তার কড়াকড়ি নিজেই আজ সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সেই অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির রূপ তুলে ধরে।

আমেরিকার অভ্যন্তরীণ ট্রমা আজ বিশ্বের অন্যান্য ট্রমার সাথে বৈপরীত্য তৈরি করে। সম্প্রতি নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানী প্রকাশ করেছেন যে হামলার পর গ্রাউন্ড জিরোর বাতাস স্বাস্থ্যকর ছিল না তা তৎকালীন প্রশাসন জানলেও গোপন রাখা হয়েছিল, যার ফলে পরবর্তীতে হাজার হাজার মানুষ ফুসফুসের রোগ ও ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। নিউইয়র্কের এই ঘটনা যেমন সত্য, তেমনই আজ গাজার পুরো অঞ্চল জুড়ে যে আমেরিকান প্রযুক্তির বোমাবর্ষণে লাখ লাখ টন ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বিপন্ন, সেই বাস্তবতার কোনো ছায়া এখানে নেই। খালিদ শেখ মোহাম্মদের মতো অভিযুক্তদের ওপর সিআইএ-র অমানবিক নির্যাতনের দরুন সিআইএ যে তথ্য আদায় করেছিল, তা আদালতে গ্রহণযোগ্য নয় বলে সম্প্রতি মার্কিন বিচারক রায় দিয়েছেন। অথচ মূল অপরাধের বিচার বহু বছর ঝুলে থাকলেও কেবল প্রতিশোধের বয়ানকেই এই জাদুঘরে ফেরি করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, এই বিশাল স্থাপনা এবং বাইরের ‘রিফ্লেক্টিং অ্যাবসেন্স’ বা শূন্যতার স্মারকটি এক বিশাল ট্রমাকে বাণিজ্য ও যুদ্ধনীতির হাতিয়ার হিসেবে বাঁচিয়ে রেখেছে। মিউজিয়ামের প্রবেশমূল্য, ভেতরের নানা স্যুভেনির এবং থাইল্যান্ডে তৈরি ‘নেভার ফরগেট’ লেখা মগ বিক্রি করা স্মারক দোকানগুলো প্রমাণ করে কীভাবে একটি মানবিক ট্রমাকে শেষ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় ও বাণিজ্যিক প্রচারণায় রূপ দেওয়া হয়েছে। এই মিউজিয়াম আমেরিকার নিজস্ব কান্না ধরে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু আমেরিকার কারণে কাঁদা বাকি পৃথিবীর কান্নার কোনো স্থান এতে হয়নি।

সূত্র: মিডলইস্ট আই