রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমার স্ত্রী ও ছেলে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়। এরপর মেয়ে। আর এখন আমি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দেড় মাসের মধ্যে পরিবারের চারজনই ডেঙ্গুজ্বরের কবলে পড়লাম।’ রাজধানীসহ সারা দেশে ধারাবাহিক বাড়ছে ডেঙ্গুরোগীর চাপ। প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে। রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসাসেবার ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশালসহ বিভিন্ন বিভাগের হাসপাতালেও বাড়ছে ডেঙ্গুরোগী ভর্তি। রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় মেঝেতে রেখে চলছে চিকিৎসা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) দেশে ৭৪৭ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫৯ হাজার ১৪৭ জন। মারা গেছে ১৭৬ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৪ হাজার ১৩৩ জন।
ঢাকার যেসব হাসপাতালে রোগী বেশি : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতালভিত্তিক হিসাবে রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুরোগী ভর্তি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, ১৫৪ জন। এরপর ঢাকা মেডিকেলে ১০৫, মুগদায় ৪৯, কুর্মিটোলায় ৪৩ এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৪২ জন। এ ছাড়া মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি আছে ৩৭ জন। রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলে ৬১৭ জন ডেঙ্গুরোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। চলতি বছর ঢাকা মহানগরীর এসব হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ১৩ হাজার ৯৮১ জন। সরেজমিন সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, মেডিসিন ওয়ার্ড ডেঙ্গুরোগীতে পূর্ণ। রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় মেঝেতে রেখে চলছে চিকিৎসা।
হাসপাতালের পরিচালক নন্দ দুলাল সাহা জানান, ১ হাজার ৩৫০ শয্যার এ হাসপাতালে ডেঙ্গুরোগীর জন্য ১৯১টি শয্যা নির্ধারিত থাকলেও বুধবার সেখানে ২৪৭ জন চিকিৎসাধীন ছিল। তিনি জানান, রোগীর এ বাড়তি চাপ সামলাতে হাসপাতালটিতে এখনো বাড়তি কোনো জনবল দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমাদের সাধারণ মেডিসিন ওয়ার্ডে অথবা মেঝেতে জায়গা করে রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।’
শুধু রাজধানী নয়, বাড়ছে অন্য বিভাগেও : ডেঙ্গুর চাপ এখন শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নেই। চলতি বছর এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে খুলনা বিভাগে, ৯ হাজার ৬৪৫ জন। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ৮ হাজার ৪৭৮, বরিশালে ৮ হাজার ২৯০, রাজশাহীতে ৩ হাজার ৫৫৬, ময়মনসিংহে ৩ হাজার ৩১২, রংপুরে ১ হাজার ৭১৫ ও সিলেটে ২৭১ জন। বর্তমানে খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুরোগী ভর্তি আছে ১ হাজার ৯১ জন। এ বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী খুলনা জেলায়। চলতি বছর খুলনা জেলায় ৫ হাজার ৩৯১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। শুধু খুলনা মেডিকেলেই ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৯৮৮ জন। চট্টগ্রাম বিভাগেও রোগীর চাপ কম নয়। এ পর্যন্ত বিভাগটিতে ৮ হাজার ৪৭৮ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলায় ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ৯৬৯ এবং কক্সবাজারে ১ হাজার ৩০১ জন।
আগস্টে রেকর্ড, সেপ্টেম্বরে অব্যাহত ঊর্ধ্বগতি : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বছরের মাঝামাঝি থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। আগস্টে ২৩ হাজার ৩০১ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে; যা চলতি বছরের মাসভিত্তিক হিসাবে সর্বোচ্চ। সেপ্টেম্বরের ১৮ দিনেও নতুন ২ হাজার ৫৩৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। অন্যদিকে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যাও বেড়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা ১৭৬ দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে নারী ৫২ দশমিক ৬ আর পুরুষ ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ। আক্রান্তের মধ্যে অবশ্য পুরুষের হার বেশি, ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ। নারী ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক, কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘অক্টোবরের সম্ভাব্য বিস্তার ঠেকাতে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও তথ্যপ্রমাণভিত্তিক প্রতিরোধব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। কোনো এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব ও ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা দুটিই বেশি থাকলে সংক্রমণ দ্রুত বাড়ে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পাঁচ জোনে পরিচালিত জরিপে গুলশান ও উত্তরায় এডিস মশার উপস্থিতি ও ঘনত্ব বেশি পাওয়া গেছে। তাই ঢালাও মশক নিধন অভিযান চালিয়ে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া কঠিন। কোথায় মশার প্রজনন বেশি হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্টভাবে প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। কার পার্কিং, বাসাবাড়ির পানির পাত্র, পানির মিটার ও নির্মীয়মাণ ভবনকে গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘যেসব প্রজননস্থল সরাসরি অপসারণ বা ধ্বংস করা সম্ভব, তা দ্রুত করতে হবে। যেগুলো অপসারণ সম্ভব নয়, সেখানে সঠিকভাবে লার্ভিসাইড প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।’ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদের মতে আরও অন্তত তিন থেকে চার দশক ডেঙ্গু দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে টিকে থাকতে পারে। অর্থাৎ ডেঙ্গুকে আর সাময়িক কিংবা মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন দেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি। এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন বা স্ট্রেন। দেশের ১৮ থেকে ২০ কোটি মানুষের একটি বড় অংশ যতক্ষণ না চার ধরনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জন করছে, ততক্ষণ সংক্রমণের চক্র চলতে থাকবে। এর সঙ্গে প্রতি বছর জন্ম নেওয়া নতুন শিশুরা যুক্ত হবে ডেঙ্গুর নতুন সম্ভাব্য শিকার হিসেবে।





