এবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের বাড়তি গুরুত্ব কেন

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশন শুরু হয়েছে। অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকালে তিনি এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।

প্রতিবছরই বিশ্বনেতাদের এই সমাবেশ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এবার বাংলাদেশের গুরুত্বের জায়গাটি কিছুটা আলাদা। কারণ, এই অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেন এবং আগামী এক বছর ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

এটি অবশ্য বাংলাদেশের জন্য প্রথমবারের ঘটনা নয়। প্রায় চার দশক আগে, ১৯৮৬–৮৭ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন। ফলে খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও কোনো বাংলাদেশি এই গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরলেন।

সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানের দায়িত্বের মূল জায়গা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ নয়, বরং সব সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা, সমঝোতা ও ঐকমত্য তৈরির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বলেছেন, সব সদস্যরাষ্ট্রকে সম্পৃক্ত করে আস্থা পুনর্গঠন এবং আলোচনার মাধ্যমে অভিন্ন জায়গা খুঁজে বের করাই তার অন্যতম লক্ষ্য। এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্যও ‘আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন সামলানো এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’।

তবে এই দায়িত্ব বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিকভাবে কিছু বাড়তি সুযোগ তৈরি করতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয়গুলোর একটি রোহিঙ্গা সংকট। খলিলুর রহমান নিজেই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সরাসরি কাজ করেছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে থেকে তিনি সংকটটি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার সুযোগ পাবেন। ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিষয়টি তুলে ধরার সুযোগ পাবেন।

জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন অর্থায়ন, শান্তি ও নিরাপত্তা এবং জাতিসংঘের সংস্কারের মতো বিষয়ও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খলিলুর রহমান তার মেয়াদের অগ্রাধিকার হিসেবে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু কার্যক্রম, শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের বিষয়গুলো সামনে এনেছেন। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও স্বার্থ আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও দৃশ্যমান করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে সভাপতির পদকে বাংলাদেশের জন্য সরাসরি কোনো বিশেষ সুবিধা আদায়ের মাধ্যম হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। খলিলুর রহমান নিজেও বলেছেন, তিনি সব সদস্যরাষ্ট্রের সভাপতি এবং তার দায়িত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে পুরো সাধারণ পরিষদ। তাই বাংলাদেশের জন্য এবারের বিশেষত্ব মূলত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতার চেয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রস্থলে থাকার সুযোগে। প্রায় চার দশক পর আবার একজন বাংলাদেশি যখন বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল আন্তর্জাতিক ফোরামটির সভাপতির আসনে, তখন এবারের সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য যে বাড়তি দৃশ্যমানতার সুযোগ তৈরি করেছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।