নন-ক্যাডারদের পদোন্নতি না নিলেই অসদাচরণ, নতুন বিধিমালায় থাকছে শাস্তি

নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি নিয়ে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত বিধিমালায় পদোন্নতির জন্য যোগ্যতা অর্জনের পরও কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী স্বেচ্ছায় পদোন্নতি নিতে অস্বীকৃতি জানালে সেটিকে অসদাচরণ হিসেবে বিবেচনার বিধান রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি চাকরি আইনের আওতায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

খসড়া বিধিমালা অনুযায়ী, পদোন্নতির ক্ষেত্রে বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনের (এসিআর) গড় নম্বরও গুরুত্বপূর্ণ হবে। আগের পাঁচ বছর অথবা ফিডার পদে চাকরির সময়—এই দুইয়ের মধ্যে যে সময়টি কম, সেই সময়ের ন্যূনতম গড় নম্বর হতে হবে ৮০। আর গড় নম্বর ৬৯-এর নিচে হলে সেটিকে বিরূপ মন্তব্য হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে অবসরোত্তর ছুটিতে থাকা কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হবেন না।

পদোন্নতির ক্ষেত্রে শুধু যোগ্য শূন্য পদই বিবেচনায় নেওয়া যাবে। লিয়েন কিংবা চলতি দায়িত্বের কারণে সাময়িকভাবে সৃষ্টি হওয়া শূন্য পদে কাউকে পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিধি) মো. মোস্তফা জামান জানান, ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির জন্য নতুন বিধিমালা তৈরির কাজ চলছে। একটি খসড়া তৈরি করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। তবে বিধিমালাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে এতে কী কী নতুন বিধান যুক্ত হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।

এদিকে সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া মনে করেন, নতুন বিধিমালা প্রণয়নের ফলে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়তে পারে। তার মতে, বিধিমালা যথাযথভাবে তৈরি না হলে সরকারকে বিভিন্ন ধরনের মামলা-মোকদ্দমার মুখোমুখি হতে হতে পারে। পুরোনো বিধিমালা সংশোধনের পরিবর্তে নতুন করে বিধিমালা তৈরি করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রশাসনে কর্মকর্তার ঘাটতিও এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে তিনি মনে করেন।

জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে যেসব বিষয় বিবেচনায় আসবে

খসড়ায় বলা হয়েছে, নতুন বিধিমালার বিধান সব নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে। পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আগে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা একই পদ্ধতিতে পরে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের চেয়ে জ্যেষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত হবেন।

একই সময়ে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে একাধিক ব্যক্তি নিয়োগ পেলে এবং সেই নিয়োগ কমিটি বা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে হয়ে থাকলে, তাদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে সংশ্লিষ্ট কমিটি বা কমিশনের তৈরি মেধাতালিকা অনুযায়ী। মেধাতালিকা না থাকলে বয়সের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে। বয়সও একই হলে শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের শিক্ষাবর্ষ এবং এরপর ফলাফলের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সমন্বিত জ্যেষ্ঠতার ক্ষেত্রে পদোন্নতিযোগ্য পদের ফিডার পদে নিয়মিতভাবে যোগদানের তারিখকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হবে। যোগদানের তারিখ একই হলে বয়স, বয়সও একই হলে শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের শিক্ষাবর্ষ বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি প্রতিটি ফিডার পদের মেধাক্রমও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।

মামলা চললে পদোন্নতি আটকে যাবে

বিভাগীয় মামলা, দুদকের মামলা কিংবা ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি নিয়েও খসড়ায় নির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় অভিযোগনামা দাখিল, দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় চার্জশিট দাখিল, ফৌজদারি মামলা করার সরকারি অনুমোদন অথবা গ্রেফতারের ঘটনা ঘটলে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার পদোন্নতি বন্ধ থাকবে।

দণ্ডের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পদোন্নতি থেকে বিরত রাখার প্রস্তাব রয়েছে। লঘুদণ্ডের মেয়াদ এক বছর এবং গুরুদণ্ডের মেয়াদ দুই বছর হলে, দণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরও দুই বছর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হবেন না।

অন্যদিকে বিভাগীয় মামলা, দুদকের মামলা বা ফৌজদারি অভিযোগ থেকে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অব্যাহতি পেলে এবং সংশ্লিষ্ট পদে শূন্যতা থাকলে তাকে পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ থাকবে। এ ক্ষেত্রে তিনি ধারণাগত জ্যেষ্ঠতাও পাবেন।

কোটার বাইরে পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতা মিলবে না

খসড়ায় বলা হয়েছে, কমিটি বা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতেই উচ্চতর স্কেলে পদোন্নতি দিতে হবে। বিভাগীয় পদোন্নতির ক্ষেত্রে নির্ধারিত কোটার মধ্যেই পদোন্নতি সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।

কোনো কারণে নির্ধারিত কোটার বাইরে অতিরিক্ত পদোন্নতি দেওয়া হলে সেই পদোন্নতিপ্রাপ্তদের জ্যেষ্ঠতা পদোন্নতির তারিখ থেকে গণনা করা যাবে না। অন্যদিকে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কোনো পদে নিয়োগ দেওয়া হলে কমিটি বা কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী যোগদানের তারিখ থেকেই ওই পদে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জ্যেষ্ঠতা গণনা করা যাবে।

বিভাগীয় পদোন্নতির ক্ষেত্রে আগে সুপারিশ পাওয়া কর্মকর্তারা পরবর্তী সময়ে সুপারিশ পাওয়া কর্মকর্তাদের তুলনায় জ্যেষ্ঠ হবেন। একই ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একসঙ্গে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করা হলে তাদের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা বয়সের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে।

পদোন্নতি প্রত্যাখ্যান করলে শাস্তির বিধান

খসড়া বিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো—কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতির জন্য যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তা গ্রহণ না করলে সেটিকে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা হবে।

সরকারি চাকরি আইনে অসদাচরণের জন্য লঘুদণ্ড ও গুরুদণ্ডের বিধান রয়েছে। লঘুদণ্ডের মধ্যে রয়েছে তিরস্কার, পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা এবং মূল বেতনস্কেলের নিচের ধাপে নামিয়ে দেওয়া। গুরুদণ্ডের মধ্যে রয়েছে নিম্নপদ বা নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ, বাধ্যতামূলক অবসর এবং সরকারি চাকরি থেকে অপসারণ।

প্রশাসনে নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে সহকারী সচিব পদে পদোন্নতি নিতে অনাগ্রহী বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। বিশেষ করে ঢাকায় কর্মরত অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতির পর ঢাকার বাইরে বদলির আশঙ্কায় পদোন্নতি নিতে চান না। সচিবালয় থেকে উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তর পর্যন্ত নন-ক্যাডারদের বেশ কিছু পদে সুযোগ-সুবিধা থাকায় বর্তমান পদ ধরে রাখার প্রবণতাও রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে পদোন্নতির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে নতুন বিধিমালায় কঠোর বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে পুরো বিধিমালাটি এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে এবং অংশীজনদের মতামত নেওয়ার পর এর চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণ করা হবে।