আগেভাগেই শুরু হয়েছে দৌড়ঝাঁপ, যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কে?

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গেই বাজতে শুরু করেছে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডঙ্কা। ক্যালেন্ডারের পাতায় ২০২৬ সাল হলেও ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগাম হাওয়া। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দিকে কে হবেন তার উত্তরসূরি এবং হোয়াইট হাউসের পরবর্তী বাসিন্দা, তা নিয়ে ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান দুই শিবিরেই শুরু হয়ে গেছে জোর তৎপরতা। মার্কিন রাজনীতিতে এই অকাল বোধন তৈরি করেছে এক অভূতপূর্ব মেরুকরণ, যেখানে উভয় দলেরই সম্ভাব্য প্রার্থীরা মধ্যবর্তী নির্বাচনের আড়ালে নিজেদের জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করার দৌড়ে নেমে পড়েছেন।

সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ দলের প্রার্থীদের সমর্থনে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে প্রচারণা চালিয়ে থাকেন। তবে এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রাথমিক বাছাইপর্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতে এখন থেকেই নিয়মিত সফর করছেন। জাতীয় নীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি তারা ভোটারদের মন বোঝার চেষ্টা করছেন, সংগঠন মজবুত করছেন এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক জোট বাঁধার ভিত্তি তৈরি করছেন। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রসঙ্গটি সহজে স্বীকার করতে না চাইলেও খোদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার সময় উল্লেখ করেন যে তিনি আর মাত্র আড়াই বছর ক্ষমতায় থাকবেন। তাঁর এই মন্তব্য ২০২৮ সালের নির্বাচনকেন্দ্রিক আলোচনাকে আরও উস্কে দিয়েছে।

ডেমোক্র্যাটিক শিবিরে গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পরাজিত হওয়ার ধাক্কা কাটিয়ে নতুন নেতৃত্বের খোঁজে তৎপরতা দৃশ্যমান। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস সম্প্রতি সুইং স্টেট হিসেবে পরিচিত মিশিগানে সফর করে দলের সিনেট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদের পক্ষে সমর্থন চান। ২০২৪ সালে হাতছাড়া হওয়া রাজ্যগুলোতে তিনি আবারো নিজের অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, নিউইয়র্কের তরুণ ও প্রভাবশালী কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের মাঝে নিজের প্রভাব দ্রুত বাড়াচ্ছেন। প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারার শীর্ষ নেতা বার্নি স্যান্ডার্সের উত্তরসূরি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চাওয়া ওকাসিও-কর্টেজ সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারগুলোতে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে জীবনের বড় সুযোগগুলো একবারই আসে, যদিও তার নারী ও লাতিনা পরিচয় নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নানা হিসাব-নিকাশ রয়েছে।

এ ছাড়া ডেমোক্র্যাটিক দলের বেশ কয়েকজন দূরদর্শী গভর্নর ইতিমধ্যেই জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছেন। পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জশ শাপিরো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ন্ত্রণের জাতীয় নীতি নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন, যেখানে তিনি ট্রাম্পের অবস্থানের সরাসরি সমালোচনা করেন। কেনটাকির গভর্নর অ্যান্ডি বেসিয়ার জাতীয় পরিচিতি বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে ‘গো অ্যান্ড ডু লাইকওয়াইজ: হাউ উই হিল অ্যা ব্রোকেন কান্ট্রি’ শীর্ষক বই প্রকাশ করে আলোচনায় এসেছেন। গ্রামীণ ও ঐতিহ্যগতভাবে রক্ষণশীল এলাকার মানুষের কাছে পৌঁছানোর বার্তা দিচ্ছেন তিনি। আবার ইলিনয়ের গভর্নর জেবি প্রিটজকার ট্রাম্পের কঠোর সমালোচক হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করার পাশাপাশি সম্প্রতি ব্যাপক ওজন কমিয়ে ব্যক্তিগত জীবনেও আলোচনার সৃষ্টি করেছেন। পাশাপাশি জর্জিয়ার সিনেটর জন অসফ এবং আরিজোনার সিনেটর মার্ক কেলির নামও সম্ভাব্য দৌড়ে গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে।

অন্যদিকে রিপাবলিকান শিবিরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ছায়া থেকে বের হয়ে নিজেদের স্বাধীন অবস্থান তৈরি করার কঠিন লড়াই চলছে। বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে এই শিবিরের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাক-প্রার্থী মনে করা হচ্ছে। তিনি সম্প্রতি নির্বাচনের প্রাথমিক বাছাইয়ের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য আইওয়া সফর করেছেন। তবে মাত্র দুই বছর সিনেটর থাকার পর ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়া ভ্যান্সের জন্য ট্রাম্পের উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা এবং একই সঙ্গে নিজস্ব স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অস্তিত্ব গড়ে তোলা এক বড় চ্যালেঞ্জ। সাবেক প্রতিদ্বন্দ্বী টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজও প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুপ্ত বাসনা প্রকাশ করেছেন এবং আবার লড়াইয়ে নামার বার্তা দিয়েছেন।

রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য তালিকায় আরও রয়েছেন টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট, ফ্লোরিডার বিদায়ী গভর্নর রুন ডিস্যান্টিস এবং সিনেটর রিক স্কট। অবাধ বাণিজ্য ও শুল্কবিরোধী ধারার প্রতিনিধি হিসেবে কেনটাকির সিনেটর র‌্যান্ড পলও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা ৫০-৫০ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে ঐতিহাসিকভাবে যেমনটা দেখা গেছে, এই তালিকার বাইরে থেকেও নতুন কোনো চমকপ্রদ মুখের আবির্ভাব ঘটতে পারে।

২০২৮ সালের এই নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে, কারণ উভয় দলকেই নতুন মুখ সামনে আনতে হবে। রিপাবলিকানদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা ট্রাম্পের মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন নীতিতে অটল থাকবে নাকি চিরাচরিত রক্ষণশীলতায় ফিরে যাবে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে এমন এক অভিভাবক খুঁজে নিতে হবে, যিনি দলের ভেতরের প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থি; দুই ধারাকেই একসঙ্গে মেলাতে সক্ষম হবেন।

সূত্র: সিএনএন