এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাসের বাজারে নৈরাজ্য যেন থামছেই না। একদিকে পাইপলাইনের গ্যাসের সংকটে এলপিজির ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়তি দামের সঙ্গে যোগ হয়েছে কৃত্রিম সংকট। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) চলতি অক্টোবর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করলেও অধিকাংশ এলাকায় সেই দামে গ্যাস মিলছে না। খুচরা বাজারে একই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত।
এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রাহকদের সঙ্গে বিক্রেতাদের বাগ্বিতণ্ডা হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামের কথা বললে অনেক বিক্রেতা সিলিন্ডার বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানান। অথচ বাড়তি টাকা দিতে রাজি হলেই মিলছে সিলিন্ডার। ফলে ভোক্তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে বাজার তদারকিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও।
ডিলার ও ব্যবসায়ীদের দাবি, গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে বিভিন্ন কোম্পানি সরবরাহ ৫০ শতাংশের বেশি কমিয়ে দেওয়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। তবে এলপিজি অপারেটরদের দাবি, দেশে এলপিজি আমদানিতে কোনো ঘাটতি নেই। ডিলারদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলো থেকে তাদের বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। অন্যদিকে অপারেটরদের একাংশের দাবি, অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি চক্র সিলিন্ডার মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়াসহ নানা কারণে এলপিজির মূল্য সমন্বয় হতে পারে। কিন্তু সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির কোনো সুযোগ নেই। বাজারে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজন হলে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।
কৃত্রিম সরবরাহ সংকট :
দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাসের তীব্র সংকট থাকায় বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে এলপিজির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। ফলে এই জ্বালানির চাহিদাও বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বাড়তি চাহিদার সুযোগ নিয়ে একটি অসাধু চক্র বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। পর্যাপ্ত আমদানি থাকার পরও কোথাও কোথাও সিলিন্ডার মজুত করে রাখা হচ্ছে। পরে সংকটের অজুহাতে বেশি দামে তা বিক্রি করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ ভোক্তারা। রান্নার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহৃত জ্বালানির দাম এভাবে বাড়তে থাকায় বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোকে।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে আমদানি :
সরকারি হিসাবে, গত আগস্টে দেশে প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। দেশে বছরে এলপিজির চাহিদা প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন। প্রায় এক কোটি গ্রাহক এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ এলপিজি ব্যবহৃত হয় বাসাবাড়ির রান্নার কাজে।
ফলে এলপিজির সরবরাহ ও দামের ওপর বাজারের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। বিশেষ করে পাইপলাইনের গ্যাসের সংকটের কারণে যেসব পরিবার বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার ব্যবহার করছে, তাদের জন্য বাড়তি দামের চাপ আরও বেশি।
কয়েকটি কোম্পানির হাতে বড় বাজার :
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে এলপিজি সিলিন্ডারের বিশাল বাজারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে কয়েকটি কোম্পানির হাতে। এলপিজি ব্যবসার জন্য সরকার থেকে এ পর্যন্ত ৬০টি কোম্পানি লাইসেন্স নিয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে চালু রয়েছে ২৯টি। তবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে নিয়মিত এলপিজি আমদানির জন্য এলসি খুলতে পারছে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র চারটি কোম্পানি দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৬৮ শতাংশ সরবরাহ করছে। বাকি কোম্পানিগুলোর অনেকেই ঋণখেলাপি বা নানা সমস্যার কারণে এলপিজি আমদানির জন্য এলসি খুলতে পারছে না। ফলে লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি হলেও বাস্তবে বাজারের বড় অংশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপরই নির্ভরশীল।
দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশই বেসরকারি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। ফলে আমদানি, সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব থাকায় বাজারে প্রতিযোগিতা ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অপারেটরদের বক্তব্য :
বাড়তি দাম ও সরবরাহ সংকটের বিষয়ে বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, এলপিজি আমদানি কমেনি। খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতাদের কারণে সমস্যা তৈরি হয়ে থাকতে পারে। কোনো অপারেটর বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করছে—এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে শুধু অপারেটর পর্যায়ে নয়, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়েও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
কঠোর নজরদারির দাবি :
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, বিইআরসির নির্ধারিত দামে কোথাও এলপিজি বিক্রি হচ্ছে না। ভোক্তাদের বেশি দামেই কিনতে হচ্ছে। এলপিজি খাতের অনিয়ম ঠেকাতে বিইআরসি, প্রতিযোগিতা কমিশন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে তাদের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে নতুন করে লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এলপিজির বাজারে মূল্য নির্ধারণের পর তা কার্যকর হচ্ছে কি না, সরবরাহ স্বাভাবিক আছে কি না এবং কোথাও মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি জরুরি। নইলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত দাম কাগজে থাকলেও বাস্তবে ভোক্তাদের বাড়তি দামেই সিলিন্ডার কিনতে হবে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই জ্বালানি নিয়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।





