পাহাড়ে পাহাড়ে জুম কাটার উৎসব, বাম্পার ফলনে চাষিদের মুখে হাসি

সবুজ পাহাড়জুড়ে সোনালি ধানের সমারোহ। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে ধানের পাশাপাশি ফলেছে নানা জাতের মিশ্র ফসল। পাকা ধান ঘরে তুলতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন জুমচাষিরা। কোথাও চলছে ধান কাটার কাজ, কোথাও তোলা হচ্ছে মরিচ, হলুদ, আদা, মারফাসহ বিভিন্ন ফসল। জুমের ফসল ঘরে তোলার আনন্দে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা মেতে উঠেছেন ঐতিহ্যবাহী গানে।

পাহাড়ে জুমের ফসল কাটাকে ঘিরে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের কাছে জুমের গান ও ফসল তোলার আনন্দ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। দিনভর জুমের কাজ শেষে সন্ধ্যায় পাহাড়ের মাচাংঘরে বসে গানের আসর। পাকা ধান কাটার সময় গানের সুরে মুখর হয়ে ওঠে পাহাড়ি জনপদ।

জুমচাষি অমিয় কান্তি চাকমা বলেন, জুমের পাকা ধান সংগ্রহের মৌসুম শুরু হয়েছে। জুমে ধানের পাশাপাশি মরিচ, হলুদ, আদা, মারফা, বেগুন, ধানিমরিচ, ঢেঁড়শ, কাঁকরোল ও কুমড়াসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হয়েছে। এসব ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা।

স্থানীয় জুমচাষি অজয় চাকমা জানান, বীজ বপনের পর প্রায় পাঁচ মাস পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। জুমে শুধু ধান নয়, ভুট্টা, তুলা, তিল, আদা, হলুদ, মরিচ, বেগুন, মিষ্টি কুমড়া, ঢেঁড়শ, কলা, পেঁপে, যবসহ প্রায় ৩৩ ধরনের ফসল চাষ করা হয়।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত পৌষ-মাঘ মাসে পাহাড়ের ঢালে গাছপালা ও বনজঙ্গল কেটে পুড়িয়ে জুম চাষের জমি প্রস্তুত করা হয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে ওই জমিতে বিভিন্ন ধরনের বীজ বপন করেন চাষিরা। ভাদ্র-আশ্বিন মাসে ধান পাকে। এরপর কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে তুলা, তিল ও যব সংগ্রহ করা হয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে একটি পাহাড়ে জুম চাষের পর পরবর্তী চাষের জন্য অন্য পাহাড় বেছে নেন চাষিরা।

রাঙামাটি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, রাঙামাটিতে চলতি বছর প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে জুম চাষ হয়েছে। এতে ১১ হাজার মেট্রিক টন ধান এবং অন্যান্য ফসল ২০ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলায় প্রায় ১৮টি জাতের জুমের ধান চাষ হয়।

তিনি বলেন, একই পাহাড়ে পুনরায় জুম চাষ করতে হলে অন্তত ১৫ বছর অপেক্ষা করা প্রয়োজন। কিন্তু জমির পরিমাণ কমে আসায় একই পাহাড়ে বারবার জুম চাষের ফলে উৎপাদন আগের তুলনায় কমেছে। এ ছাড়া জুমের জমি প্রস্তুত করতে বনজঙ্গলে আগুন দেওয়ায় জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হয় এবং খাদ্যসংকট তৈরি হতে পারে।

জুম চাষের বিকল্প হিসেবে কৃষকদের দীর্ঘমেয়াদি বাগান করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ করে মিশ্র ফলের বাগান গড়ে তুলতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এতে বন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি কৃষকদের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে পার্বত্যাঞ্চলে প্রতিবছর ঠিক কত হেক্টর জমিতে জুম চাষ হয়, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এখনো কৃষি বিভাগের কাছে নেই।