বহন করা সহজ, লাভ এবং কার্যকারিতাও বেশি- এমন ভয়ংকর সিনথেটিক ড্রাগের ব্যবহার বাড়ছে দেশে। ল্যাবে তৈরি ১৩ ধরনের এই মাদক আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিদের বাংলাদেশ নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সিনথেটিক মাদক ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সিরা। আইস বা ক্রিস্টাল মেথের চোরাচালান বা বিক্রি বাড়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোও রুখতে হিমশিম খাচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ২০১৯ সালে প্রথম চালান আটক হওয়ার পর থেকে নজরদারি বাড়ানোয় প্রতিনিয়ত ভয়ংকর একের পর এক এই মাদক জব্দের ঘটনা ঘটছে।
আগে থেকেই দেশে প্রচলিত মাদক যেসব ব্যবসায়ীরা কেনাবেচা করত, তারাই মূলত নতুন সিনথেটিক মাদক নতুন পণ্য হিসেবে ধীরে ধীরে বাজারে প্রবেশ করাচ্ছে, সঙ্গে যোগ হচ্ছে অল্পবয়সি তরুণ-তরুণীরা। এরা অনলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিজেদের ‘সেফজোনে’ রেখে ব্যবসায় জড়াচ্ছে।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহর এবং সীমান্তসংলগ্ন জেলাগুলো মাদক পাচার ও ব্যবহারের প্রধান কেন্দ্র বা ‘হাব’ হিসেবে কাজ করছে। কম বিনিয়োগে বেশি লাভের লোভে তরুণ-তরুণীরা সিনথেটিক মাদক ব্যবসায় ঝুঁকে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে। সহজে বহন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে ধরা পড়ার ভয় কম থাকায় তারা এতে জড়িয়ে পড়ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইয়াবা এবং আইসের (ক্রিস্টাল মেথ) মতো সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদকের ব্যবহার ও চাহিদা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সহজলভ্যতা ও আকর্ষণের কারণে আইস ও ক্রিস্টাল মেথের মতো সিনথেটিক মাদক তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশি ছড়াচ্ছে।
এগুলো গন্ধহীন এবং বহন করা তুলনামূলক সহজ হওয়ায় এর ব্যবহার বাড়ছে। মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ও আইসের চালান দেশের ভেতরে প্রবেশ করছে, যা পরবর্তীতে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
সিনথেটিক মাদক স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করে। এর প্রভাবে মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি, অনিদ্রা, হৃদরোগ, কিডনি বিকল হওয়া এবং মানসিক অবসাদ বা আগ্রাসী আচরণ দেখা দেয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও সরবরাহ ও চাহিদা পুরোপুরি রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বে সিনথেটিক মাদকাসক্তির সংখ্যা বাড়ছে। নানা পথে বিগত ২০১৮ সাল থেকে দেশে সিনথেটিক মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটছে। মাদক মাফিয়ারা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মাদক তৈরি করছে ল্যাবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এক পরিসংখ্যান বলছে, ল্যাবে তৈরি সিনথেটিক মাদক দ্রুত আসক্তি তৈরি করে।
বাংলাদেশে সিনথেটিক নেশায় আসক্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। দেশে প্রচলিত ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিলের বলয় ভেঙে ল্যাবে তৈরি ১৩টি নতুন সিনথেটিক মাদক সারা দেশে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। এসব সিনথেটিক মাদক শক্তিশালী ও মরণঘাতী। ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত এসব মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটেছে নানা পথে।
এগুলো হচ্ছে- খাত, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), এমডিএমএ, এলএসডি, টাপেন্টাডল, ট্রামাডল, ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম, ডিওবি, কুশ, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জমাট হেরাইন, ব্ল্যাক কোকেন ও এমডিএমবি।
এসব নতুন মাদক ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে ডাকযোগে আকাশপথে পার্সেল হিসেবে আসে। দেশের বর্তমান সময়ে তরুণ সমাজ ও মাদকাসক্তদের মধ্যে ইয়াবা, আইস (মেথামফেটামিন), এলএসডি ও কেটামিনের মতো সিন্থেটিক বা কৃত্রিম মাদকের চাহিদা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। প্রথাগত মাদকের তুলনায় এগুলো পরিবহন করা সহজ এবং অনেক ক্ষেত্রে দাম নাগালে থাকে।
ডিএনসি সূত্র জানায়, ল্যাবে তৈরি নতুন নতুন সিনথেটিক মাদক শিডিউলভুক্ত না হওয়ায় পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা কিছুটা জটিল। শিডিউলভুক্ত মাদকের চেয়ে সিনথেটিক মাদক কেনাবেচা ও বহন করা অনেকটা সহজ এবং আর্থিকভাবে দ্রুত লাভবান হওয়া যায়। প্রাকৃতিক মাদকের চেয়ে সিনথেটিক মাদক দ্রুত আসক্তি তৈরি করে। তাই দেশে সিনথেটিক মাদকের চাহিদা দিনে দিনে বেড়েই চলছে। অল্প পরিমাণ মাদক দিয়েই বৃহৎ বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে নতুন এসব মাদকের বিস্তারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ডার্ক ওয়েব, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সিনথেটিক মাদক কেনাবেচা করা হচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশে নিয়ে এসে অনলাইন ও অফলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা জানান, তরুণ সমাজের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া নতুন সিনথেটিক মাদক রুখতে সর্বত্র কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হচ্ছে। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে মাদক কারবারিদের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নতুন কোনো মাদক পেলেই তা ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হচ্ছে। তাতে সিনথেটিক মাদক প্রমাণিত হলেই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (চিকিৎসা ও পুনর্বাসন) শামীম আহম্মেদ জানান, গন্ধহীন ও আকারে ছোট হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এগুলো সহজে সরবরাহ করা যায়। অনেক তরুণ প্রচলিত মাদকের চেয়ে এগুলোতে কম ক্ষতি হবে এমন ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে সেবন শুরু করে। তবে, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে স্মৃতিশক্তি হ্রাস, তীব্র মানসিক অবসাদ ও সাইকোসিস বা মানসিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। হৃদরোগ, কিডনি ও লিভারের মারাত্মক ক্ষতি এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। অতিরিক্ত সেবনে ব্যবহারকারীরা উগ্র ও সহিংস আচরণ করে বসে। নতুন এই মাদক ব্যবহার ও চোরাচালান রুখতে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলেও জানান শামীম আহমেদ।
ডিএনসিসির এই কর্মকর্তা আরও জানান, সিনথেটিক মাদক গ্রহণে মানুষের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ বা সেল ধ্বংস করে দেয়। মানুষের স্বাভাবিক স্মৃতিশক্তি এবং চিন্তার ক্ষমতা হ্রাস পায়। তীব্র মানসিক বিভ্রান্তি, অবাস্তব জিনিস দেখা এবং অহেতুক সন্দেহ বাড়ায়। তীব্র হতাশা ও আত্মহত্যার প্রবণতা সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদে লিভার সিরোসিস এবং কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ে। অত্যন্ত শক্তিশালী রাসায়নিক উপাদানে সিনথেটিক মাদক গ্রহণে শরীরের প্রধান অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো হঠাৎ অকেজো হয়ে যেতে পারে, যা অকালমৃত্যুর কারণ হয়।
সম্প্রতি প্রকাশিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ‘বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৫’-এ এই চিত্রে দেখা যায়, দেশে মাদক উৎপাদন না হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের অন্যতম ট্রানজিট। ট্রানজিটের পাশপাশি বাংলাদেশ সব ধরণের মাদকের বড় বাজারে পরিণত হয়েছে। নতুন ১৩ ধরনের সিনথেটিক মাদকের বিস্তারে সবচেয়ে ঝুঁকিতে ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সিরা। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট এবং গোল্ডেন ওয়েজের মতো বৈশ্বিক মাদক উৎপাদনকেন্দ্রগুলো থেকে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে মাদক পাঠানো হয়। আর যেসব রুটে মাদক পাঠানো হয়, তার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান। এ ছাড়া ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে থাকা দীর্ঘ ও দুর্গম সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রগুলো বাংলাদেশে মাদক প্রবেশ করাচ্ছে। ২০২৫ সালের মাদক পরিস্থিতি পর্যালোচনা দেখা যায়, দেশের অবৈধ মাদকের বাজারে এখনো অ্যাম্পেটামিন-টাইপ স্টিমুল্যান্ট, বিশেষ করে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের আধিপত্য বেশি। গত এক বছরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত অভিযানে প্রায় ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৬০ হাজার (৪৩.৫ মিলিয়ন) পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।
এ ছাড়া ভয়াবহ সিনথেটিক মাদক আইস বা ক্রিস্টাল মেথের চোরাচালানও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি সৃষ্টি করছে। গাঁজা, হেরোইন, কোডিনযুক্ত সিরাপ (ফেনসিডিল) এবং ইনজেকশনযোগ্য মাদকের বিস্তারও অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে নতুন নতুন রাসায়নিক বা সিনথেটিক মাদকের প্রবেশ এবং ‘নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্ট্যান্স’ হিসাবে পরিচিত এমডিএমএ, এলএসডি, সিনথেটিক ক্যানাবিনয়েডস, ট্যাপেন্টাডল, বুপ্রেনরফিন এবং কুশের মতো মারাত্মক মাদকের বিস্তার ঘটছে। পাচারকারীরা এখন আর কেবল সনাতন বা প্রচলিত মাদকের ওপর নির্ভর করছে না। তারা মাদকের বাজারে বৈচিত্র্য আনছে। বিক্রির কৌশলেও ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিতে চক্রগুলো এখন ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড অ্যাপস এবং অনলাইন ব্ল্যাকমার্কেট বা ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করছে। ফলে অনলাইনে খুব সহজে মাদক লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে; যা নিয়ন্ত্রণ করা জটিল হয়ে উঠছে। পাচারের জন্য স্থলপথের পাশাপাশি নদীপথ, সমুদ্রপথ, আকাশপথও ব্যবহার করা হচ্ছে।
এদিকে, গত ১৮ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উচ্চমূল্যের ৪ হাজার ১৮০ গ্রাম কুশ জব্দ করা হয়। তা ছাড়া ২২ আগস্ট কক্সবাজারের টেকনাফে নাফ নদী থেকে তিন কেজি ক্রিস্টাল মেথসহ মিয়ানমারের এক নাগরিককে আটক করে বিজিবি। নাফ নদীতে অভিযান চালিয়ে ওই মাদক জব্দ করা হয়। দেশে গত বছরের ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়া থেকে আসা নতুন মাদক এমডিএমবির চালান জব্দ করা হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে প্রথমবারের মতো ধরা পড়ে ব্ল্যাক কোকেন নামে নতুন মাদক। ২০২১ সালের নভেম্বরে খুলনায় উদ্ধার করা হয় ভয়াবহ ডিওবি (ডাইমিথোক্সিবোমো এমফিটামিন) মাদক, যা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পোল্যান্ড থেকে এসেছিল। সেটিও দেশে প্রথম শনাক্ত হয়। আর ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর জিগাতলায় প্রথমবারের মতো আইস উদ্ধার করা হয়। একই বছরের জুলাইয়ে মহাখালী ডিওএইচএসের একটি বাসা থেকে প্রথমবারের মতো এলএসডি উদ্ধার হয়।





