কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি গান, ছবি, বই ও অন্যান্য সৃজনশীল কাজ দ্রুত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের তৈরি কাজের সঙ্গে এআইয়ের তৈরি কাজের পার্থক্য করা কঠিন। তবে শিল্পের ক্ষেত্রে স্রষ্টা মানুষ কি না, সেটি অনেকের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। এআইয়ের বিস্তারের মধ্যে মানুষের হাতে তৈরি শিল্পের বাড়তি মূল্য তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে চলছে আলোচনা।
যুক্তরাজ্যের কর্নওয়ালের ফালমাউথ শহরে কয়েক সপ্তাহ আগে একটি সংগীতানুষ্ঠানে ডিজে হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন এক লেখক ও সংগীতশিল্পী। প্রায় ২৫০ জনের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত সেই আয়োজনে দর্শক, শিল্পী, কর্মী, সংগীত ও একসঙ্গে নাচের অভিজ্ঞতা মিলে তৈরি হয়েছিল অনন্য এক মুহূর্ত। পুরো অভিজ্ঞতাটিই ছিল মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা।
কিন্তু ডিজের জগতেও প্রযুক্তি অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। নব্বইয়ের দশকে ডিজেদের ভিনাইল রেকর্ড, দুটি টার্নটেবল ও মিক্সার ব্যবহার করে একটির সঙ্গে আরেকটি গানের ছন্দ মেলাতে হতো। এখন সফটওয়্যার দিয়েই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গানের ছন্দ মেলানো যায়। অ্যাপল মিউজিক ও স্পটিফাইয়ের মতো প্ল্যাটফর্মেও রয়েছে এআইনির্ভর গান মেশানোর সুবিধা।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে, কোনও ডিজে যদি নিজে গান মেশানোর বদলে শুধু একটি বোতাম চাপেন, তবু তার বাজানো গান ভালো লাগলে শ্রোতাদের কি কিছু যায় আসে? এই প্রশ্ন এখন শুধু সংগীতের নয়; ছবি আঁকা, বই লেখা, চলচ্চিত্র নির্মাণসহ শিল্পের প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
এআইয়ের তৈরি গান চিনতে পারেন না অধিকাংশ শ্রোতা
সংগীত প্ল্যাটফর্ম ডিজারের তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্ল্যাটফর্মে আপলোড হওয়া গানের ৪৪ শতাংশই এআই দিয়ে তৈরি। প্রতিষ্ঠানটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৭ শতাংশ শ্রোতা এআইয়ের তৈরি গান ও মানুষের তৈরি গানের মধ্যে পার্থক্য শনাক্ত করতে পারেননি। তবে জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেকের বেশি মানুষ বলেছেন, গানটি মানুষ তৈরি করেছেন, নাকি এআই- তা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তারা সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় মানুষের অংশগ্রহণ চান।
লন্ডনের কিংস কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক ড্যানিয়েল সাসকিন্ডের মতে, শিল্পের ক্ষেত্রে মানুষ শুধু চূড়ান্ত ফলটিই মূল্যায়ন করেন না; সেটি একজন মানুষের সৃজনশীলতা ও কল্পনা থেকে এসেছে- এই বিষয়টিও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
সিস্টিন চ্যাপেলের ছাদে আঁকা চিত্রকর্মের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, দর্শকের কাছে সেই শিল্পকর্মের সৌন্দর্যের পাশাপাশি বিস্ময়কর বিষয় হলো, তার মতোই রক্তমাংসের একজন মানুষ এমন সৃষ্টি করেছেন। মানুষের মেধা ও কল্পনার এই পরিচয় শিল্পকে আলাদা মূল্য দেয়।
১৯৯৭ সালে বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভ কম্পিউটার ডিপ ব্লুর কাছে হেরে যাওয়ার পরও দাবার জনপ্রিয়তা কমেনি; বরং তা আরও বেড়েছে। সাসকিন্ডের মতে, দাবায় শুধু চালগুলো নয়, চালের পেছনে থাকা মানুষের উপস্থিতিও দর্শকের আগ্রহের অংশ।
মানুষের তৈরি শিল্পে বাড়তি মূল্য
প্রযুক্তিবিষয়ক সাময়িকী দ্য নিউ ইয়র্কারের সাংবাদিক কাইল চাইকা মনে করেন, এআই দিয়ে লেখা অনেক কিছুই একঘেয়ে, অতিরিক্ত তোষামোদপূর্ণ ও গতানুগতিক হয়ে উঠছে। এর বিপরীতে পাঠকেরা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব কণ্ঠস্বরসমৃদ্ধ লেখার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হতে পারেন। এমনকি কিছুটা অগোছালো বা কম পরিশীলিত লেখাও তাদের কাছে বেশি মানবিক মনে হতে পারে।
চাইকার মতে, চিত্রাঙ্কন ও গ্রাফিক নকশার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এআই সহজেই গড়পড়তা নকশা তৈরি করতে পারায় শিল্পীরা আরও ব্যতিক্রমী, অদ্ভুত ও নজরকাড়া কাজের দিকে ঝুঁকছেন।
এআইয়ের তৈরি কনটেন্ট থেকে মানুষের তৈরি কাজ আলাদা করে চিহ্নিত করতে ‘মানুষের তৈরি’ ধরনের স্বীকৃত লেবেল চালুর উদ্যোগও নিচ্ছেন গবেষকেরা। ইতোমধ্যে কিছু বই, চলচ্চিত্র ও অ্যালবামের প্রচ্ছদে ‘এআই-মুক্ত’ পরিচিতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
লেখক জন ল্যানচেস্টারও মনে করেন, যেসব জিনিসকে সহজে পণ্যে পরিণত করা যায় না, সেগুলোর মূল্য বরং বাড়তে পারে। তার ভাষায়, কোনও একটি বিষয়কে পণ্যে পরিণত করলে যেসব বিষয়কে একইভাবে পণ্যে পরিণত করা যায় না, সেগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অ্যালগরিদম কি বদলে দিচ্ছে আমাদের রুচি?
তবে মানুষের তৈরি শিল্পের কদর দীর্ঘমেয়াদে বাড়বে কি না, তা নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। এআইয়ের তৈরি কনটেন্ট এত দ্রুত বাড়ছে যে ভবিষ্যতে কোন কাজে এআই ব্যবহার করা হয়েছে, তা বোঝা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এছাড়া এআই জনপ্রিয় হওয়ার আগেই অ্যালগরিদম মানুষের সাংস্কৃতিক রুচি গঠনে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। আগে মানুষ বইয়ের দোকান, বন্ধুদের পরামর্শ কিংবা নিজের অনুসন্ধানের মাধ্যমে নতুন গান, বই ও চলচ্চিত্র খুঁজে নিতেন। এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুমান করে একের পর এক কনটেন্ট সামনে হাজির করছে।
চাইকার মতে, এতে মানুষ নতুন কিছু আবিষ্কারের সুযোগ পেলেও সাংস্কৃতিক রুচির গভীরে যাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। কঠিন বই বা প্রথমে অদ্ভুত মনে হওয়া চলচ্চিত্রের মতো কাজ শুরুতে বিরক্তিকর মনে হলেও পরে তা মানুষের চিন্তাভাবনা বদলে দিতে পারে। কিন্তু অ্যালগরিদম সাধারণত ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখে- এমন কনটেন্টকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
সরাসরি অভিজ্ঞতার আকর্ষণ কি টিকে থাকবে?
প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সরাসরি অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে বলে মনে করেন সুপারস্ট্রাক্ট এন্টারটেইনমেন্টের প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্স মাহন। তার প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সংগীত উৎসব ও সরাসরি বিনোদন আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত।
অ্যালেক্স মাহনের মতে, মানুষ এমন অভিজ্ঞতা চান, যেখানে অনিশ্চয়তা, তাৎক্ষণিক উত্তেজনা ও নতুন কিছু আবিষ্কারের সুযোগ থাকে। অন্যদের সঙ্গে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে সরাসরি সংগীত শোনার অভিজ্ঞতা প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা কঠিন।
১৯৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গণিত শেখার ক্ষেত্রে ক্যালকুলেটরের ব্যবহার নিয়ে শিক্ষকদের প্রতিবাদ হয়েছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে শিক্ষার্থীরা মৌলিক গণিত ভুলে যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্যালকুলেটর দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে ওঠে।
এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই রকম পরিবর্তন ঘটতে পারে। তবে শিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার কোথায় গ্রহণযোগ্য আর কোথায় মানুষের অংশগ্রহণ অপরিহার্য- তার কোনও একক উত্তর নেই। শেষ পর্যন্ত শিল্পের মূল্য নির্ধারণে সৃষ্টির সৌন্দর্যের পাশাপাশি স্রষ্টার মানবিক অভিজ্ঞতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যেককেই নিতে হবে। সূত্র: বিবিসি





