রাজনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ‘এআই মন্ত্রী’ নিয়োগ : আলবেনিয়া কি ইইউ’র পরীক্ষাগার?

রাজনীতি ও শাসনকাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার নিয়ে বড় ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে ইউরোপের দেশ আলবেনিয়া। কারাবন্দী মেয়রের এআই-জেনারেটেড অবতারের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রথম ‘এআই মন্ত্রী’ নিয়োগ—তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শাসনের পথে দেশটির উদ্যোগ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এই উচ্চাভিলাষী ডিজিটাল উদ্যোগ ঘিরে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও আইনি বিতর্কেরও সৃষ্টি হয়েছে।

সম্প্রতি আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানার মেয়র এরিয়ন ভেলিয়াজকে কেন্দ্র করে এ সংক্রান্ত নতুন একটি বিতর্ক দেখা যায়। দুর্নীতির অভিযোগ ও আর্থিক অনিয়মের তদন্তাধীন অবস্থায় ২০২৫ সালের শুরু থেকে তিনি কারাবন্দী রয়েছেন। অবশ্য এসব অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছেন মেয়র। কিন্তু কারাগারে থাকা অবস্থাতেই প্রশ্নবিদ্ধ কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা এক ভিডিওতে তিনি শিশুদের জন্য বিনামূল্যে টিফিন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে ভিডিওটির বিশেষত্ব হলো, এটি মেয়রের বাস্তব কোনো উপস্থিতি নয়, বরং তার একটি ‘এআই অবয়ব’ বা ডিজিটাল অবতার।

কারাবন্দী মেয়রের এই অবতার ব্যবহার আলবেনিয়ার রাজনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের একটি উদাহরণ মাত্র। এর আগে দেশটির প্রধানমন্ত্রী এডি রামা সরকারি চুক্তি ও দরপত্র তদারকির উদ্দেশ্যে ‘দেলা’ নামে একটি এআই-চালিত ভার্চুয়াল মন্ত্রী পদ চালু করেন। দুর্নীতির ঝুঁকিতে থাকা সরকারি খাতগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই ছিল এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মন্ত্রীর মূল লক্ষ্য।

আলবেনিয়া বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ দুর্নীতি সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ৯১তম অবস্থানে রয়েছে দেশটি। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা এআই আইন কার্যকর থাকায় সেখানে এমন প্রশাসনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো জটিল। ফলে ইইউ আলবেনিয়াকে একটি ‘কেস স্টাডি’ বা পরীক্ষাগার হিসেবে পর্যবেক্ষণ করছে, যাতে রাজনীতি ও গণমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের নীতিমালা কঠোর করা যায়।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়া ইইউ-এর এআই আইন অনুযায়ী, যেকোনো ডিপফেক বা এআই দিয়ে তৈরি অডিও, ভিডিও ও ছবিতে স্পষ্ট লেবেলিং বা চিহ্নিতকরণ বাধ্যতামূলক। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসারের তুলনায় ইইউ-এর আইনি সংস্কারের গতি পিছিয়ে আছে বলে মনে করেন সমালোচকেরা।

এদিকে বিশ্বের প্রথম এআই মন্ত্রী হিসেবে ‘দেলা’কে নিয়োগ দেওয়া হলেও প্রকল্পটি সম্পূর্ণ মসৃণ হয়নি। আলবেনীয় অভিনেত্রী অনিলা বিশার মুখাবয়ব ও কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে ‘দেলা’ চরিত্রটি তৈরি করা হয়েছিল। তবে অনিলা বিশা সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দাবি করেন, তার চেহারা কোনো হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক চরিত্রে রূপান্তরের জন্য তিনি কোনো অনুমতি দেননি।

অন্যদিকে বিরোধীরাও দেলার নিয়োগ নিয়ে দেশটির সাংবিধানিক আদালতে চ্যালেঞ্জ জানায়। তবে আদালত মামলাটি খারিজ করে দিয়ে পর্যবেক্ষণ দেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল একটি প্রযুক্তিগত সহায়কমাত্র; এটি কোনোভাবেই সার্বভৌম রাষ্ট্রক্ষমতা, দায়িত্ব বা জবাবদিহিতা প্রতিস্থাপন, হস্তান্তর বা পরিচালনা করতে পারে না।

এমতাবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন্দ্রিক নতুন এই রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে আলবেনিয়া যেন রাষ্ট্র পরিচালনায় এআই-এর ভূমিকা পরীক্ষার একটি অপ্রত্যাশিত পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। আর ইউরোপসহ পুরো বিশ্ব আলবেনিয়ার এই গতিপথের দিকে সতর্ক নজর রাখছে।

তথ্যসূত্র : আল-জাজিরা।