বাংলাদেশের বিজ্ঞানী, গবেষক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, তাদের ধারণা দেশটি করোনাভাইরাসের তৃতীয় ঢেউয়ের চূড়া অতিক্রম করেছে, তবে সতর্ক না হলে আবারো নতুন ঢেউয়ের আশঙ্কা আছে।
সংক্রমণ সংখ্যা, হার ও মৃত্যুর গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে তারা বলছেন, মূলত জানুয়ারির শেষ সপ্তাহেই চূড়া অতিক্রম করেছে বাংলাদেশে।
তারা বলছেন, জানুয়ারির শেষ দিকে যারা সংক্রমিত হয়েছেন তাদের অনেকের অবস্থা গুরুতর হওয়ার কারণেই এখন ২/৩ সপ্তাহ পর এসে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি বা ঊর্ধ্বমুখী।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট বা আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর বিবিসিকে বলেছেন, তারা মনে করছেন করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার এখন নিম্নমুখী এবং পিক সময়টা পার হয়েই এসেছে বলা যায়।
‘ট্রেন্ডটা এখন নিম্নমুখী তবে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ সংক্রমণের হার এখনো অনেক কমতে হবে। শতকরা ১০ শতাংশের নিচে এবং এরপর ৫ শতাংশের নিচে আসতে হবে ধারাবাহিকভাবে। সেটি হচ্ছে কিন্তু খুব ধীরগতিতে,’ বলছিলেন তিনি।
অর্থাৎ আগের দু’দফায় সংক্রমণের চূড়ায় উঠার পর সংক্রমণ যে গতিতে কমে এসেছিল এবার তুলনামূলক কম গতিতে সেটি কমছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালের ৮ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হিসেবে মোট শনাক্ত হয়েছে ১৮ লাখ ৯৪ হাজার ৫৩৫ জন। আর এ সময়ে মোট মারা গেছে ২৮ হাজার ৭৪৪ জন।
তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল বলছেন, স্বাস্থ্য বিভাগের এ হিসেবে দেশের প্রকৃত চিত্র নেই, কারণ স্বাস্থ্য বিভাগ শুধু হাসপাতালে করা টেস্ট বা চিকিৎসার জন্য আসা ব্যক্তিদের তথ্য-উপাত্তই দিয়েছে।
‘অনেকে বাড়িতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন যাদের খোঁজ কেউ রাখেনি,’ বলছিলেন তিনি।
এমনই একজন ঢাকার শ্যামলী রহমান।
‘করোনার সব লক্ষণ ছিল আমার। আমি নিজেই বাসায় আলাদা হয়ে গেছি। টেস্ট করাইনি, কিন্তু পরিচিত চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়েছি। কয়েকদিন পরই খাবারে স্বাদ-গন্ধ ফিরে পেয়েছিলাম। পরে আর কোনো সমস্যা বোধ করিনি,’ বলছিলেন তিনি।
করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের সময়কার চিত্র
বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি প্রায় সাড়ে তিন মাস নিয়ন্ত্রণে থাকার পর গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে সংক্রমণ আবার বাড়তে শুরু করে।
এরপর ৬ জানুয়ারি দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা হাজার ছাড়ায় এবং এর দু’সপ্তাহের মাথায় ২০ জানুয়ারি দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দিনে দৈনিক সংক্রমণ ১০ হাজারের ওপরেই ছিল।
আর এর মধ্যে ২৮ জানুয়ারি সংক্রমণের হার ছিল সর্বোচ্চ ৩৩ শতাংশ এবং সেদিন ১৫ হাজার ৪৪০ জনের আক্রান্ত হওয়ার খবর দিয়েছিল স্বাস্থ্য বিভাগ। এর আগের চার দিন সংক্রমণ হার ছিল ৩২ শতাংশের ঘরে।
৩০ জানুয়ারি সংক্রমণের হার কিছুটা কমলেও পরদিন ৩১ জানুয়ারি আবার বেড়ে ৩০ শতাংশে পৌঁছেছিল।
যদিও এরপর থেকে সংক্রমণের হার ক্রমাগত কমতে থাকে এবং ৮ ফেব্রুয়ারি তা ২০ শতাংশে নেমে আসে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার সংক্রমণ হার ছিল ১৭ শতাংশ।
অন্যদিকে গত ৫ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে ৮ ফেব্রুয়ারি এবং সেদিন ৪৩ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছিল স্বাস্থ্য বিভাগ।
মূলত ৩০ জানুয়ারির পর মৃত্যুর সংখ্যা দৈনিক ৩০ জন বা এর ওপরে ওঠে। সেদিন থেকে এ পর্যন্ত মাত্র এক দিন ৬ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু হয়েছিল ২৯ জনের।
এবারের আক্রান্তদের ৮০ ভাগই ওমিক্রন থেকে
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট জানিয়েছে, এবার জানুয়ারি মাসে যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে তাদের ৮০ ভাগের শরীরে ওমিক্রন আর ২০ ভাগের শরীরে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের লক্ষণ পাওয়া গেছে।
পহেলা জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সংগ্রহ করা নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং (জিন নকশা উন্মোচন) করে প্রতিষ্ঠানটি এ তথ্য প্রকাশ করেছে গত বুধবার।
সংস্থাটি বলছে, ওমিক্রন একসাথে অনেক মানুষকে আক্রান্ত করে, যদিও এর ধরনকে মৃদু মনে করে অনেকে এটিকে অবহেলা করছেন।
স্বামীর কাজের সুবাধে ঢাকার বাইরে থাকেন সাফিয়া আক্তার। তার পরিবারের সবাই এক সাথে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। যদিও তিনি ও তার স্বামী টেস্ট করিয়েছিলেন।
‘বাকিদের টেস্ট করানোর দরকারই মনে হয়নি। কারণ সবার একই লক্ষণ ছিল। আমরা সতর্ক থেকেছি। পরে সবাই সুস্থ হয়েছি,’ বলছিলেন তিনি।
আবার দ্বিতীয়বারের মতো করোনায় আক্রান্ত হওয়া শাহানা বেগম বলছেন, আগের দফায় তিনি ও তার স্বামী আক্রান্ত হলেও এবার তিনি একাই আক্রান্ত হয়েছেন।
‘মাথাব্যথা আর কাশির কারণে টেস্ট করেছিলাম। পজিটিভ রিপোর্ট এলো। তবে ৩/৪ দিন পরে সব ঠিক হলো। আর টেস্ট করাইনি,’ বলছিলেন তিনি।
আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর বিবিসিকে বলেছেন, ‘আমরা ওমিক্রনের যত মিউটেশন দেখছি সেটি আবার ততোই সংক্রমিত হচ্ছে। যখনই ভাইরাস ব্যাপক ট্রান্সমিশনে থাকে তখন ভাইরাসের আরো বেশি মিউটেশনের সম্ভাবনা থাকে। তখন হয়তো ভাইরাসটি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। আবার শক্তিশালীও হতে পারে।’
তবে এটি সত্যি যে ওমিক্রন আগের যেকোনো ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় অনেক বেশি সংক্রামক হলেও, রোগীকে আগের মতো কাঁবু করতে পারে না এবং এই ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি কিংবা মৃত্যুর হারও অনেক কম।
চূড়া কী পার হয়েছে বাংলাদেশে
আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর ও সংস্থাটির উপদেষ্টা মুশতাক হোসেন এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল – তিনজনই একমত যে এ দফায় করোনার পিক বা চূড়া পার করেছে বাংলাদেশ।
আবু জামিল ফয়সাল বলছেন, জানুয়ারির শেষ সপ্তাহেই পিক সময়টা পার হয়েছে এবং এরপর থেকে ইনফেকশন রেটও কমছে।
‘শনাক্ত সংখ্যা ও সংক্রমণের হার কমছে। আরো কমবে। তবে মৃত্যু সংখ্যা কমতে কিছু সময় লাগবে। সংক্রমণ কমছে বলে আমরা যেন আপ্লুত না হই। কারণ সতর্ক না হলে এ বিপদ সামনে আরো বড় হয়ে আসতে পারে,’ বলছিলেন তিনি।
ডা: মুশতাক হোসেন বলছেন, এখন যারা মারা যাচ্ছে তারা ২/৩ সপ্তাহ আগেই আক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ এখন সংক্রমণ কম কিন্তু মৃত্যু বেশি হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘তবে মনে রাখতে হবে যে ঘুরেফিরে নতুন নতুন ওয়েভ আসতে পারে। সেটি পুরনো ভাইরাস দিয়েও হতে পারে আবার নতুন ভ্যারিয়েন্ট দিয়েও হতে পারে। কারণ মিউটেশন হয়ে কখন কোন ভ্যারিয়েন্ট কেমন হয় তা তো আমাদের জানা নেই।’ তথ্যসূত্র : বিবিসি।
প্রভাতনিউজ/এনজে





