দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রায় এক দশক পর বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলার চার্জশিট চূড়ান্ত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এ আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় দেশি-বিদেশি ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্তের তালিকায় নাম রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ আরও ১০ কর্মকর্তার। এ ছাড়া ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, চীন, জাপান, ভারত ও উত্তর কোরিয়ার বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামও রয়েছে তালিকায়।
দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই ডিজিটাল কেলেঙ্কারির মামলা তদন্তে ফরেনসিক প্রতিবেদন, ফিলিপাইনের এমএলএআর, এফবিআই রিপোর্ট; জাপান, ভারতের সুপারিশ; শ্রীলঙ্কা থেকে অর্থ ফেরতের রেকর্ড, সুইফটের তথ্য, সংগৃহীত নতিথপত্র ও ১৬১ ধারায় নেওয়া জবানবন্দির ভিত্তিতে জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে। শিগগিরই আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, দশ হাজার পৃষ্ঠার এই চার্জশিট চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে কেলেঙ্কারির সাথে জড়িতদের পৃথক ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে।
২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার (তখনকার হিসেব অনুযায়ী প্রায় ৮১০ কোটি টাকা) ডিজিটাল মাধ্যমে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়। সুইফট কোড ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের এই অর্থ হাতিয়ে নেয় হ্যাকাররা। বাংলাদেশ ব্যাংক ঘটনার একদিন পরে চুরির তথ্য জানতে পারলেও তা গোপন রাখে আরও ২৪ দিন। বিষয়টি তৎকালীন অর্থমন্ত্রীকে বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় ৩৩তম দিনে। আর ঘটনার ৩৯ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি।
রিজার্ভ চুরির মামলাটির বর্তমানে তদন্ত করছেন সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন। তিনি গণমাধ্যমকে তদন্ত শেষ হওয়ার কথা জানিয়েছেন। দ্রুত আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে বলেও জানান তিনি।
তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানের নানা গাফিলতি, ঘটনা গোপন করা, আলামত মুছে দেওয়ার চেষ্টাসহ বিভিন্ন সংশ্লিষ্টতা বেরিয়ে আসে। চূড়ান্ত চার্জশিটে ড. আতিউর রহমান আসামির তালিকায় রয়েছেন। এ ছাড়া ওই সময়ের ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সভাপতি আনিস এ খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মহাব্যবস্থাপক কে এম আবদুল ওয়াদুদ, সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক রেজাউল করিম, তৎকালীন উপমহাব্যবস্থাপক মেজবাউল হক, সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা, ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের সাবেক উপ-পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা, ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সি ম্যানেজমেন্টের মহাব্যবস্থাপক মো. সুলতান মাসুদ আহম্মেদ ও গভর্নর সচিবালয়ের মহাব্যবস্থাপক এ এফ এম আসাদুজ্জামানের নাম রয়েছে অভিযোগপত্রে।
এছাড়া ফিলিপাইনের কাম সিন ওং, মায়া সান্তোস দেগুইতো, রাউল ভিক্টর বি তান, ব্রিজিট আর কাপিনা, নেস্তর ও পিনেদা, রোমুয়ালদো এস আগারাডো, অ্যাঞ্জেলা রুথ এস টরেস, লোরেঞ্জো তান, মিস ন্যান্সি, জাও কিওগ, ডেনিস সি ব্যানকোড, ইসমায়েল আর রেইস, সাবিনো এম ইকো, মিস লিজেন্ড জে রাসেলা, রিচার্ড ইনসাইন, উইলিয়াম সোঁ গো (তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন), সালুদ রেইস বাউতিস্তা শেবা, মিশেল বাউতিস্তা কনকন, অ্যান্থনি এ পেলেজো, জন ইউ, লুইস ফাব্রেগাস খো, ম্যান পো চান, মিং ই সাইমন সি, রোজালিও পরানতা তান্দুয়ান, এনরিকে কে রাজোন, থমাস আরাসি, জোসে এডুয়ার্ডো জে আলারিলা, ক্রিশ্চিয়ান আর গনজালেস, ডোনাটো সি আলমেইদা ও ফ্লিন্ট রিচার্ডসনের নাম এসেছে। এ ছাড়া দেশটির রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন, ফিলরেম সার্ভিস করপোরেশন, সেঞ্চুরিটেক্স ট্রেডিং, আব্বা কারেন্সি এক্সচেঞ্জ, ইনকরপোরেশন, বিকন কারেন্সি এক্সচেঞ্জ ইনকরপোরেশন, মিডাস ক্যাসিনো ও সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনোর নাম রয়েছে অভিযুক্তের তালিকায়।
শ্রীলঙ্কার হেগোডা গামাগে শালিকা পেরেরা, ইমিয়াগে ডন মিউরিন রানাসিংহে, রামানায়েক আরাচ্চিগে ডন প্রদীপ রোহিত দামকিন, বুলুগাহা আরামবেগেদারা সাঞ্জিবা তিসা বান্দারা, ওয়েরাপুলি মুহান্দিরামগে প্রিয়াঙ্কা জয়দেব, লুয়াইস হান্নাদিগে শিরানি ধম্মিকা ফার্নান্দো ও নিশান্ত নলক ওয়ালাকুলু আরাচ্চি নাম রয়েছে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে শালিকা ফাউন্ডেশনের নামও রয়েছে অভিযোগপত্রে।
এ ছাড়া ভারতের নাগরিক নীলাভান্নান মাদুক্কুর আনন্দন, প্রীতম রেড্ডি, সুধীন্দ্র আত্রেশ ও রাকেশ আস্তানা, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার পার্ক জিন হিয়োক ও প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাজারাস গ্রুপ, চীনের ৩ নাগরিক ডিং ঝিজে, গাও শুহুয়া ও ওয়েইকাং জু এবং জাপানি নাগরিক সাসাকির নাম রয়েছে।





