বর্জ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে আপত্তি কেন, কী বলছে সরকার?

মাত্র ৪২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৫ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন নর্থ ঢাকা বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প পুনর্বিবেচনা করে বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)।

অন্যদিকে গত ১২ জুলাই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দুটি প্রকল্প (আমিনবাজার এবং মাতুয়াইল) দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রকল্প দুটি দ্রুত এগিয়ে নিতে স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করার নির্দেশ দিয়েছেন। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সংশ্লিষ্টদের প্রকল্প দুটির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।

চীনের সিএমইসি গ্রুপ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আমিনবাজারে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বিনিয়োগ করছে। এই প্রকল্পটি প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করে ৪২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৮ সালের আগস্টের মধ্যে প্রকল্পটি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করার কথা। আগামী ২৫ বছর এখান থেকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।

প্রকল্পটি দেশের অন্যতম ব্যয়বহুল এবং পরিবেশগতভাবে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ প্রকল্প। এই মর্মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরাবর একটি আবেদনপত্রও জমা দিয়েছে বিডব্লিউজিইডি।

১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে পাঠানো আবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জলবায়ুর জন্য গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে। ২০২০ সালে কোন প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই বিশেষ আইনের আওতায় প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয় এবং ২০২১ সালে বিদ্যুৎ বিভাগ, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও সিএমইসি’র মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির সাড়ে চার বছর পরও প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ৮৫ শতাংশ কার্যকারিতায় (পিএলএফ) চললে প্রতি বছর ৩১ কোটি ৬৫ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এ হিসাবে সরকার প্রতি ইউনিট ২১.৭৮ সেন্ট দরে (২৬.৭৯ টাকা) দরে বিদ্যুৎ কিনবে, যা সৌরবিদ্যুতের দরের আড়াই গুণ এবং কয়লা-বিদ্যুতের দ্বিগুণ। পিএলএফ ৪০ শতাংশে নেমে এলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ৪৭ টাকা। কোনো কারণে পিএলএফ ২০ শতাংশে নেমে এলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম দিতে হবে কমপক্ষে ৭৫ টাকা। এর ফলে বছরে নতুন ৫৮.৮৭ মিলিয়ন ডলার (৭২৪ কোটি ২০ লাখ টাকা) ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা সরকারের ঘাড়ের উপর পড়বে।

প্রস্তাবিত বাজেট অনুসারে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ৪৬৭ মিলিয়ন ডলার (৫ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা) খরচ হবে। ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, “এ পরিমাণ টাকা দিয়ে ৪২৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা যেত যেখান থেকে কোনো জ্বালানি ছাড়াই বছরে ৬৮ কোটি ৮০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতে পারতো।”

বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক (এআইআইবি) ১০০ মিলিয়ন ডলার, নয়া উন্নয়ন ব্যাংক (এনডিবি) ১০০ মিলিয়ন ঋণ এবং সিএমইসি ১৫৭ মিলিয়ন বিনিয়োগ করছে। বাকি ১১০ মিলিয়ন ডলার কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে তা কখনওই উন্মুক্ত করা হয়নি, যা প্রকল্পটির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন প্রতিদিন ৩ হাজার টন নগরবর্জ্য সরবরাহ করবে। যদি কোনো কারণে পর্যাপ্ত নগরবর্জ্য সরবরাহ করা না হয় তাহলে প্রতি টনের জন্য ৫০ মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে হবে। বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৭৫০ টন নগরবর্জ্য তৈরি হয়। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে সিটি কর্পোরেশনে আরো বেশি বর্জ্য তৈরি করতে হবে। অন্যথায় জরিমানার মুখে পড়তে হবে। ফলে পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনের বদলে ঢাকাবাসীকে নোংরা জীবনযাপনে উৎসাহিত করছে এ প্রকল্প।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরো মাত্রায় চললে ৭৩ হাজার ৫৭৬ টন বটম অ্যাশ, ফ্লাইঅ্যাশ ও অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা, ৩৯.৫৬ টন বিষাক্ত গ্যাস (ভারী ধাতু, ডায়োক্সিন ও ফুরান গ্যাস) এবং ১.১৭ টন ক্ষতিকর গ্যাস (নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও হাইড্রোজেন ক্লোরাইড) ঢাকার বাতাসে মিশে যাবে, যা প্রতি বছর ক্যান্সার, হৃদরোগ, বক্ষব্যাধি ও অ্যাজমার প্রকোপ বাড়াবে। দিল্লির বর্জ্যবিদ্যুৎকেন্দ্র বায়ুদুষণ কমানোর চেয়ে বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্জ্য পুড়িয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে ১.৩ থেকে ১.৮ কেজি কার্বন নির্গমন হয় যা কয়লা-বিদ্যুতের প্রায় দ্বিগুণ ও গ্যাস-বিদ্যুতের তিনগুণ। পূর্ণমাত্রায় চললে নর্থ ঢাকা বর্জ-বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে ৪ লাখ ১১ হাজার ৩৯২ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে, যার সরাসরি ভূক্তভোগী হবে ঢাকার নগরবাসী এবং বাংলাদেশের মোট কার্বন নির্গমন বাড়িয়ে দিবে।

এআইআইবি’র পরিবেশ ও সামাজিক নীতিমালা অনুসারে স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণ, তথ্য প্রকাশ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও প্রকল্পে এসব শর্ত যথাযথভাবে মানা হয়নি। বাংলাদেশের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় ১ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে বর্জ্য পোড়ানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে, কিন্তু গত ১৬ এপ্রিল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় শুধুমাত্র সিএমইসি’র স্বার্থে রাষ্ট্রীয় আইন সংশোধন করে ৮৫০ ডিগ্রি অনুমোদন করার প্রস্তাব দিয়েছে।

হাসান মেহেদী বলেন, “একটি কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালার মানদণ্ড শিথিল করার উদ্যোগ আইনের শাসন ও জনস্বার্থের পরিপন্থী।”

বর্জ্য বিদ্যুৎ ব্যয়বহুল হলেও এখানে বিদ্যুৎকে বিবেচনায় না নিয়ে বিপুল পরিমাণ বর্জ্যকে বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলে আসছেন সংশ্লিষ্টরা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি কৌশলপত্রে বর্জ্য বিদ্যুতের কথা উল্লেখ করেছে সরকার। সম্প্রতি এক সভায় বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ম্যানেজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সিটির বর্জ্য রাখার জায়গা হচ্ছে না, সেটাকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় আনতে পারলে সেটাই কম কি। যেটুকু বিদ্যুৎ পাওয়া যায় সেটাই লাভ।