দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকে নতুন অর্থবছরের শুরুতেই দেখা দিয়েছে মিশ্র চিত্র। এক মাসের ব্যবধানে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। কিন্তু গত বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনায় কমেছে প্রায় ২ শতাংশ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়ায় সামগ্রিক পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে ওভেন পোশাকে। একই সঙ্গে কানাডার বাজারেও উল্লেখযোগ্য ধস নেমেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বাংলাদেশ থেকে বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩৮৮ কোটি ৬৭ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলারের। গত বছরের জুলাইয়ে এ রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩৯৬ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। তবে আগের মাস জুনের তুলনায় পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জুনে পোশাক রপ্তানি হয়েছিল ৩৩৮ কোটি ৭৭ লাখ ১০ হাজার ডলার। সেই হিসাবে মাত্র এক মাসে রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ মাসভিত্তিক হিসাবে বড় ধরনের ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত মিললেও নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসেই বছরভিত্তিক রপ্তানি কমে যাওয়ায় পোশাক খাতের সামনে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পোশাক রপ্তানির দুই প্রধান উপ-খাতের মধ্যে ওভেন পোশাকে পতন সবচেয়ে বেশি। জুলাইয়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৭২ কোটি ৭৬ লাখ ৬৬ হাজার ডলারের। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে নিট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ২১৫ কোটি ৯ লাখ ৬ হাজার ডলারের। এ খাতে বছরভিত্তিক রপ্তানি কমেছে তুলনামূলক কম, শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ। তবে জুনের তুলনায় নিট পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে ১৭ শতাংশের বেশি। ওভেনেও মাসভিত্তিক রপ্তানি বেড়েছে ১১ শতাংশের বেশি। জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জুনের তুলনায় জুলাইয়ে রপ্তানি বৃদ্ধির বিষয়টি ইতিবাচক। কিন্তু বছরভিত্তিক হিসাবে নতুন অর্থবছরের শুরুতেই রপ্তানি কমে যাওয়া বাজার পরিস্থিতির ওপর নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইউরোপের প্রধান বাজারগুলোতে পতন এবং কানাডায় বড় ধস উদ্বেগের কারণ। গত অর্থবছরও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বছরভিত্তিক কমেছিল। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। জুলাইয়ে মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় অর্ধেক ৪৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ গেছে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে। কিন্তু এ বাজারে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। জুলাইয়ে ইইউতে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৯২ কোটি ৯২ লাখ ২০ হাজার ডলারের।
ইইউর প্রধান বাজার জার্মানিতেও রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৮৪ শতাংশ। দেশটিতে জুলাইয়ে রপ্তানি হয়েছে ৪৫ কোটি ৮৩ লাখ ৯০ হাজার ডলারের পোশাক। ফ্রান্সে রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ, হয়েছে ১৬ কোটি ৯ লাখ ডলার। তবে ইউরোপের সব বাজারে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়নি। স্পেনে রপ্তানি বেড়েছে ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং নেদারল্যান্ডসে ১ দশমিক ২ শতাংশ। সবচেয়ে বড় চমক এসেছে ইতালিতে। দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৩১ দশমিক ৯১ শতাংশ। জুলাইয়ে ইতালিতে রপ্তানি হয়েছে ১৪ কোটি ২১ লাখ ৮০ হাজার ডলারের পোশাক।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এ দুই বাজার থেকে কয়েক মাস ধরে অর্ডার কমছে। এর সঙ্গে জ্বালানিসংকটও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের ঘাটতির কারণে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
প্রচলিত বড় বাজারের বাইরে বাংলাদেশের পোশাকের নন-ট্র্যাডিশনাল বাজারও জুলাইয়ে খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। এসব বাজারে সম্মিলিত রপ্তানি হয়েছে ৫৮ কোটি ২ লাখ ৬০ হাজার ডলারের, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশ কম। মোট পোশাক রপ্তানিতে এসব বাজারের অংশ এখন ১৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এসব বাজারের মধ্যে জাপানে রপ্তানি সামান্য বেড়েছে শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশ। বিপরীতে অস্ট্রেলিয়ায় কমেছে শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং ভারতে কমেছে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। মাহমুদ হাসান খান আরও বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি নেমে আসে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম। ফলে নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসের পরিসংখ্যানকে শুধু মাসভিত্তিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রধান বাজারে চাহিদা ধরে রাখা, বিকল্প বাজার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা।





