নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর ১৮০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল বিএনপি সরকার। ১৮ আগস্ট সেই কর্মসূচির সময়সীমা শেষ হচ্ছে। ফলে সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব কষতে শুরু করেছেন সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরাতে সরকারের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে চলছে আলোচনা।
গত ছয় মাসে বাজারে সরকারের নজরদারি ও অভিযান বেড়েছে। বিভিন্ন বাজারে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান, মূল্যতালিকা প্রদর্শন এবং ব্যবসায়ীদের সতর্ক করার মতো পদক্ষেপ দেখা গেছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য টিসিবির পণ্য বিক্রি ও ওএমএস কার্যক্রমও চালু রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও কাঁচাবাজারে স্থায়ী স্বস্তি ফেরেনি। কোনো কোনো পণ্যের দাম কমলেও বেড়েছে অন্য পণ্যের দাম। মূল্যস্ফীতির চিত্রেও বাজারের চাপ স্পষ্ট। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে ছিল। জুলাইয়ে তা ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে এলেও নিত্যপণ্যের বাজারে এর তেমন প্রভাব পড়েনি। ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। এপ্রিল ও মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৯ দশমিক ০৪ ও ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে। জুনে সামান্য কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে এবং সর্বশেষ জুলাইয়ে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে আসে। তবে মূল্যস্ফীতি কমার সুফল ভোক্তার বাজারে তেমন দৃশ্যমান নয়। টানা বৃষ্টি ও বন্যায় বিভিন্ন এলাকায় সবজির উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এতে বেশির ভাগ সবজির দাম কেজিতে ৮০ থেকে ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে। গত মাসের শেষ দিকে কাঁচা মরিচের দাম কেজিতে ৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। মুরগি ও ডিমের বাজারেও অস্থিরতা রয়েছে। জ্বালানি, পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বাড়ায় ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ২০০ থেকে ২১০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। ডিমের ডজনও ১৫০ টাকা স্পর্শ করেছে। বর্তমানে কিছু বাজারে দাম কমতির দিকে থাকলেও সাধারণ ক্রেতার জন্য তা এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে আসেনি। মাছ ও মাংসের দামও রয়েছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বাজারে প্রতি কেজি রুই-কাতলা ৩০০ থেকে ৩৫০, পাঙাশ ২০০ থেকে ২৫০, তেলাপিয়া ১৮০ থেকে ২২০ ও চিংড়ি ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস ৮২০ থেকে ৮৫০ ও খাসির মাংস ১ হাজার ২০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের খাদ্যতালিকায় মাছ-মাংসের পরিমাণ কমেছে। মিরপুরের একটি বাজারে কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আগের তুলনায় কিছু পণ্যের দাম কমেছে এটা ঠিক। কিন্তু বাজারে একসঙ্গে সবকিছুর দাম কমছে না। মাসের আয় একই থাকায় বাজার খরচ কমানো যাচ্ছে না। ফলে মাছ-মাংস দূরের কথা, প্রতিদিনের সবজি ও ডিম কিনতেও হিসাব করতে হচ্ছে।’ বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে এবং সেগুলোর বাস্তবায়নও শুরু করেছে।’ ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং বাজার মনিটরিং বাড়ানোকে তিনি সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনাই সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক নানান সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে পড়ছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে অভ্যন্তরীণ বাজারেও। ভোক্তার কাছে সরকারের সাফল্যের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো পণ্যের দাম। বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, মধ্যস্বত্বভোগীদের অযৌক্তিক মুনাফা কমানো এবং পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা গেলে নিত্যপণ্যের বাজারে আরও স্বস্তি ফিরতে পারে।’ কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় বাজার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বাজার মনিটরিং বেড়েছে এটা সত্য, তবে এর সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। সরকার ৬৩টি পণ্যে শুল্ক কমালেও তার কোনো প্রভাব বাজারে পড়েনি। পাশাপাশি টিসিবির কার্যক্রমও ঢিলেঢালা হয়ে পড়েছে।’





