জনজীবন এখন প্রচণ্ড সমস্যাসংকুল। বাসাবাড়িতে গ্যাস থাকে না বহুদিন। কেউ ইলেকট্রিক চুলায় রান্না করেন কেউবা লাকড়ির চুলায়। আর যারা ভীষণ ব্যস্ত, তারা এখন হোটেল রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভরশীল। এরকম পরিস্থিতিতে দু-চার দিন কাটানো যায়, মাসের পর মাস নয়। মানুষের কষ্ট ক্ষোভে রূপ নিচ্ছে। গ্যাস সংকটে মানুষ যখন দিশেহারা তখন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে গেছে লোডশেডিং। শহরের বাইরে এখন ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। মানুষ বলছে বিদ্যুৎ যায় না, মাঝেমধ্যে আসে। ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট আর তীব্র গরম মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বাসাবাড়িতে পানি নেই। মানুষ কি করবে?
বিদ্যুৎ এবং গ্যাস সংকট শুধু বাসাবাড়ির সমস্যা নয়। বরং ঘরে এই সমস্যার কেবল উপরিভাগ দেখা যায়। এই সমস্যা গোটা দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দেয়। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে শিল্প-কারখানার উৎপাদন। বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে একদম ক্ষুদ্র শিল্প কারখানা পর্যন্ত অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়ছে। কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হলে উদ্যোক্তারা বেতন দেবেন কীভাবে? ব্যাংক ঋণের টাকা পরিশোধ করবেন কীভাবে? ফলে বেতন না পাওয়া শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরা নতুনভাবে ঋণ খেলাপি হয়ে যাচ্ছেন। এটা সরাসরি প্রভাব ফেলছে আর্থিক খাতের ওপর। দেশের বেশিরভাগ ব্যাংক সংকটে, এখন যারা ব্যাংকের টাকা দিতে পারছেন না তাদের কারণে ব্যাংকের অবস্থা আরো নাজুক হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ এক অর্থনৈতিক সংকটের চক্রে জড়িয়ে গেছে। এটি দেশেকে আরও গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
অর্থনীতিতে যখন উৎপাদনশীলতা ঘাটতি হয় তখন তা বহুমাত্রিক সমস্যা তৈরি করে। এর ফলে দেশে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে হুহু করে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়ছে রপ্তানি আয়ে। বাংলাদেশ যেন ক্রমশ সংকটের অথৈ পানিতে নিমজ্জিত হচ্ছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের স্বাভাবিক নিয়ম হলো অর্থনৈতিক সংকট যত গভীর হয় সামাজিক অস্থিরতা ততই বাড়ে। অর্থের অভাবে মানুষ অপরাধপ্রবণ হয়। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি এবং হত্যার ঘটনা বাড়ে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাম্প্রতিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখন আবার তা অবনতির দিকে যাচ্ছে। এর কারণ অর্থনৈতিক সংকট। অর্থনৈতিক সংকটের ফলে বাড়ছে পারিবারিক সহিংসতা। অভাব অনটনে গৃহবিবাদ বাড়ছে। স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন, স্ত্রীর হাতে স্বামী- এসব খবর এখন পত্রিকার পাতা উল্টালেই দেখা যায়। এভাবেই বিদ্যুৎ এবং গ্যাস সংকট দেশকে একটা অনিরাপদ রাষ্ট্রের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
একটি রাষ্ট্রে যখন অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে তখনই রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। জনগণের হতাশা, ক্ষোভ এবং অসন্তোষকে পুঁজি করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা শুরু করে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করে। বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত করে তোলে। সরকার এবং বিরোধী দলের রাজনৈতিক বিবাদ ও সংঘাত তৃতীয় শক্তিকে সক্রিয় করে। তারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। রাজনৈতিক সংকটকে উসকে দেয় দেশের গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের শেষ গন্তব্য হলো নতুন করে একটা ওয়ান ইলেভেনের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়েছে মাত্র ছয় মাস। সরকার দেশের দায়িত্ব নিয়েছে এক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। ইউনূস সরকার দেড় বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যার সমাধান না করে সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। সরকার কঠিন জ্বালানি তেলের সংকটে পড়ে। সেই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। নতুন করে লোডশেডিং সরকারকে এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, এই সমস্যার জন্য বর্তমান সরকার মোটেও দায়ী নয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি, দুর্নীতি এবং লুটপাটের কারণে আজকের সংকট। কথা মিথ্যা নয়। কিন্তু মানুষ এখন আর এসব অজুহাত শুনতে চায় না। রাস্তাঘাটে কান পাতলেই শোনা যায়, লুটপাট করছে তো কি হয়েছে, লোডশেডিং তো বন্ধ হয়েছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের কাছে দুর্নীতির চেয়েও বড় অপরাধ হলো বিদ্যুৎ দিতে না পারা। গ্যাস সংকট নিয়েও সাধারণ মানুষের অভিমত একই রকম। আমাদের দেশের মানুষের গোল্ড ফিশ মেমরি। অল্পদিনেই অতীত ভুলে যায়। আওয়ামী লীগ আমলে বিপু বাহিনীর লুণ্ঠনের লোমহর্ষক ইতিহাস গরমে অন্ধকারে ঘামে গোসল হয়ে যাওয়া মানুষটিকে এখন আর আন্দোলিত করে না। সে চায় বিদ্যুৎ, গ্যাস। হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, গ্যাসের অভাবে চুলা বন্ধ গৃহীনির কাছে রূপকথার গল্প। এই গল্প তাকে এখন আলোড়িত করে না। সে চায়, গ্যাস। মানুষ এখন আর কৈফিয়ত শুনতে চায় না, মানুষ চায় সমস্যার সমাধান। অতীতে কে কী করেছে সেটা মানুষ আর জানতে চায় না। মানুষ চায় সমস্যার সমাধান।
যেকোনো সরকারের প্রথম ছয়মাস সময়কে বলা হয় মধুচন্দ্রিমার সময়। এই সময় সাধারণ নাগরিকরা সরকারকে পর্যবেক্ষণ করে। সরকারের ভুল ত্রুটিগুলো সহ্য করে। কিন্তু ছয় মাস পেরিয়ে গেলে মানুষ সরকারের কাছে চায় স্বস্তিদায়ক নাগরিক জীবন। একটু শান্তি। সরকারের হানিমুন প্রিরিয়ড শেষ হয়ে গেছে। এখন সরকারকে বর্তমান সংকটের সমাধান করতে হবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস সংকটের দ্রুত সমাধান করতে হবে। অর্থনীতির চাকা সচল করতে হবে। উন্নতি ঘটাতে হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। সংকট থেকে মুক্তির জন্য সরকারকে স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। লোডশেডিং এবং বিদ্যুতের সমস্যার সহনীয় মাত্রায় সমাধান করতে পারলে অন্য সমস্যা সমাধানের পথ সহজ হবে। এ কারণে প্রথম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকারকে জরুরিভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
সংকটের আশু সমাধানের জন্য সরকার যেসব বিষয় বিবেচনা করতে পারে সেগুলো হলো-
১) বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা ও জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া দরকার। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সরকারের পক্ষে চটজলদি বিদেশ থেকে আমদানি করা সম্ভব না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়েছে। ভারতের মুম্বাইয়ে রিলায়েন্স, দিল্লিতে আদানি বিদ্যুৎ বিতরণ করে। সরকারের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পাইকারি পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা। বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারি খাতে গেলে রাষ্ট্রের দায় কমবে। সরকার যত দ্রুত এটা করবে তত তাড়াতাড়ি সংকটের সমাধান সম্ভব হবে।
২) যেকোনো সংকটে একটি দেশ প্রতিবেশীর ওপর নির্ভর করে। এজন্য প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে যে বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি সংকট চলছে তা থেকে আশু সমাধানের একমাত্র উপায় হলো প্রতিবেশীর কাছ থেকে গ্যাস ও জ্বালানি তেল নিয়ে আসা। তাই প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
৩) অনতিবিলম্বে বাসাবাড়িতে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। গৃহস্থালির কাজে মূল্যবান প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের বিলাসিতা বন্ধ করে কলকারখানায় উৎপাদন নিশ্চিত করতে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখতে হবে।
৩) দ্রুত সিএনজিচালিত গাড়ি ও অন্যান্য পরিবহনকে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
৪) সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়াতে হবে।
৫) বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয়ভাবে আইন প্রণয়ন করতে হবে।
৬) রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত চালু করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
এছাড়াও দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের কূপ খনন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সরকারকে দ্রুত সমস্যার সমাধান করতে হবে। দেশের মানুষ এখন সমস্যার সমাধান চায়।





