সিন্ডিকেটের কুফল জনসমক্ষে ফাঁস হওয়ার পর মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ বিষয়টি নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তে তৎকালীন ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সি (এসপিপিএ) সিন্ডিকেটের দুর্নীতির সত্যতা পেয়ে তৎক্ষণাৎ ২০১৯-এর সেপ্টম্বরে সংবাদ সম্মেলনে কলিং ভিসার কার্যক্রম স্থগিত করেন।
সেই থেকে এখন ২০২২ পর্যন্ত সিন্ডিকেট নিয়ে বহু দেন-দরবার, মিটিং, আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা আজো নেয়া হয়নি।
আদালতে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে যা এখনও বিচারাধীন। পরিশেষে উভয় দেশই সম্মত হয়ে ১৯ ডিসেম্বর ২০২১ এমওইউ চুক্তি স্বাক্ষর সম্পন্ন করেছে।
একদিকে মালয়েশিয়ার শিল্প-কল-কারখানার মালিকেরা শ্রমিক ঘাটতি পূরণ করে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে স্বপ্ন দেখছে। আর অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বেকার জনগোষ্ঠী আশায় বুক বাঁধছে স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়ায় গিয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের।
কিন্তু তাদের সব আশার গুড়ে বালি ছিটিয়ে ওঁৎ পেতে থাকা সিন্ডিকেট চক্র মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রীকে বুঝাতে সক্ষম হলো যে, ২৫ রিক্রুটিং এজেন্সি ও ২৫০ এজেন্ট শুধু কর্মী পাঠাতে পারবে। অবাক করা বিষয় হলো, যে মালয়েশিয়া সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ব্যবস্থা নিয়েছিল সেই দেশ এখন ওই সিন্ডিকেটের পক্ষেই মত দিল! আর বাংলাদেশ অবস্থান নিয়েছে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। তার মানে যেই হাঁটু সেই কপালে এসে ঠেকলো।
সর্বশেষ অবস্থা হলো – লেজেগোবরে হয়ে শ্রমবাজার এখন খাদের কিনারে। বর্তমান যে অনিশ্চিয়তা তৈরি হয়েছে, এ অবস্থা চলতে থাকলে আবারো বন্ধ কিংবা হাতছাড়া হতে পারে বাংলাদেশী প্রবাসীদের ২য় গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। আর এক্ষেত্রে আগে যেমন খলনায়কের ভূমিকায় ছিল সিন্ডিকেট চক্র এবারও তাই ঘটবে।
আর ঠিক এই জটিলতার কঠিন সময়ে অবশেষে মুখ খুলেছেন বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে সোমবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সোজাসাপটা কথায় বলে দিয়েছেন, বিদেশে যবার সময় কেউ যেন প্রতারিত না হন, প্রয়োজন হলে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, প্রয়োজনীয় ডাটাবেজ নিবন্ধনের মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিদেশে কর্মী পাঠাতে হবে। বঙ্গভবন থেকে মন্ত্রীসভার এক বৈঠকে সরাসরি ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় আরো যুক্ত ছিলেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও আমলারা।
মালয়েশিয়ায় সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশী কমিউনিটি মনে করে শ্রমবাজার খুললেও সিন্ডিকেটের কারণে মুক্তবাজার পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। কারণ একজন গডফাদার আছে তার কথা অনেকেই জানেন। দু’দেশের শ্রমবাজার ইস্যুতে তার কথাই শেষ কথা। এই সিন্ডিকেট খুবই শক্তিশালী। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের কাছে সরকার-মন্ত্রীও অসহায়।
তারা এতটাই শক্তিশালী যে, তারা ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়ার ক্ষমতা রাখে। কমিউনিটির এসব কথার সত্যতার কিছু ক্ষেত্রে মিল পাওয়া যায়। যেমন, গত ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর এমওইউ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। খবর পেয়ে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার ১ ডজন সাংবাদিক কুয়ালালামপুরের একটি ফাইভ স্টার হোটেলের লবিতে অপেক্ষা করতে থাকেন।
দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা অপেক্ষার পর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী মো: ইমরান আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রথমেই বললেন, আমি কোনো সিন্ডিকেট দেখতে চাই না। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কম খরচে কর্মী প্রেরণে যা যা করার সবই আমরা করছি।
তবে আরেক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ থেকে সিন্ডিকেট করতে দেয়া হবে না। কিন্তু মালয়েশিয়া থেকে সিন্ডিকেট হলে আমাদের কিছুই করার নাই। মন্ত্রী এ কথা বলার পর উপস্থিত সাংবাদিকগণ একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছেন।
মন্ত্রী প্রস্থানের পর সাংবাদিকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হলো যে, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে না হলেও মালয়েশিয়া থেকে সিন্ডিকেট ঠিকই হবে। আর মালয়েশিয়া থেকে সিন্ডিকেট হলে এর অর্থ দাঁড়ায় – যেই লাউ সেই কদু!
ঠিক এর কিছুদিন পরই মিডিয়াতে ২৫ ও ২৫০ এজেন্সির দ্বারা সিন্ডিকেটের খবর চাউর হয়ে যায়। ওই সিন্ডিকেট চক্র এতটাই শক্তিশালী যে, বাংলাদেশ সরকারকে উপেক্ষা করে গোপনে ২৫ ও ২৫০ সিন্ডিকেটের লিস্ট মালয়েশিয়ার সরকারের মানবসম্পদ মন্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে ম্যানেজ করে সিন্ডিকেটের পক্ষে তাকে রাজিও করে ফেলেছে।
বিষয়টি জনসমক্ষে তখনই খোলাসা হয় যখন মন্ত্রী এম সারাভানান প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদকে একটি অফিসিয়াল চিঠি লিখে ২৫ ও ২৫০ এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠাতে বলেন।
পরে এই চিঠির উত্তরে মন্ত্রী ইমরান আহমেদ বলেন, এই ২৫ ও ২৫০ এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠালে অবৈধ সিন্ডিকেট হয়ে যাবে, এতে করে অনিয়ম ও অসঙ্গতি হবে যা ২০০৭ সালে চালু হওয়া সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হয়েছে।
দেশের বৈধ সব এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর পক্ষে মত দেন মন্ত্রী ইমরান আহমেদ।
প্রভাতনিউজ/এনজে





