সাড়ে ৯ হাজার বিঘা জমির ধান নষ্ট

খুলনার ডুমুরিয়ার সাতটি ইউনিয়নে নোনাপানি ঢুকিয়ে সাড়ে ৯ হাজার বিঘা জমির বোরো ক্ষেত নষ্ট করেছেন স্থানীয় প্রভাবশালী চিংড়িচাষিরা। ফসল হারিয়ে কৃষকরা সর্বস্বান্ত।

পাউবোর বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে এবং স্লুইস গেট দিয়ে নোনাপানি ঢুকিয়ে তাঁরা এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে কৃষকদের অভিযোগ। এ বিষয়ে স্থানীয় এমপি, ইউএনওসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ, মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা করেও তাঁরা প্রতিকার পাননি। ফলে নোনাপানিতেই এসব নিরুপায় কৃষকের স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেছে।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে উপজেলায় ২২ হাজার ১৩৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বেশিরভাগ ইউনিয়নে বোরোর বাম্পার ফলন হবে– এমনটাই আশা ছিল কৃষক ও কৃষি অফিস-সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজ স্বার্থে জোর করে পাউবোর বেড়িবাঁধ ছিদ্র করেন এবং স্লুইস গেট দিয়ে বাঁধের ভেতর নোনাপানি ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষ শুরু করেন। এতে নোনাপানিতে ডুবে নষ্ট হয় বোরো ক্ষেত।

জানা যায়, নোনাপানির প্রভাবে উপজেলার মাগুরখালী ইউনিয়নে ৩ হাজার বিঘা, ডুমুরিয়ায় ৩শ, গুটুদিয়ায় ৪শ, ভান্ডারপাড়ায় ১৪শ, সাহসে ১২শ, শোভনায় ১৯শ ও শরাফপুরে ১৩শ বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়েছে।

উপজেলার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিলগুলোর মধ্যে রয়েছে– খোরেরাবাদ, গজালিয়া, শৈলমারী, বকুলতলা, চিত্রামারী, হোগলাবুনিয়া, মাদারতলা, আধামানিক, শিবনগর, জোরের বিল, বকুলতলা, চাঁদগড়, জালিয়াখালী, চিংড়া, সাহস, বাঁশতলা, শিবনগর ও শোভনা।

মাগুরখালী ইউনিয়নের কৃষক সুজিত মণ্ডল, বিকাশ বৈরাগী ও রণজিৎ সরদারের অভিযোগ, মাগুরখালী ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি বিমল কৃষ্ণ সানার নেতৃত্বে উপজেলার ১৭/১ পোল্ডারের আধারমানিক স্লুইস গেট দিয়ে বেড়িবাঁধের ভেতর নোনাপানি ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষের ফলে এ ইউনিয়নের ছয়টি বিলে তিন হাজার বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে।

অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান বিমল কৃষ্ণ সানা বলেন, এ ইউনিয়নে নোনাপানির চিংড়িচাষির সংখ্যা বেশি। তাই নোনাপানি ঢোকানো হয়েছে। এতে সমস্যা কী?

শোভনা ইউনিয়নের বাদুরগাছা গ্রামের কৃষক নিরাপদ মণ্ডল ও অসীম মণ্ডল বলেন, এ ইউনিয়নে প্রায় ১৯শ বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে শুধু বাদুরগাছা-বাগআচড়া বিলেই নষ্ট হয়েছে ৬০০ বিঘা ধানক্ষেত।

উপজেলার গুটুদিয়া গ্রামের কৃষক তোতা গাজী জানান, এ ইউনিয়নে প্রায় ৪০০ বিঘা জমির বোরো ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। তিনি তিন বিঘা জমি ৩১ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়ে, ৪০ হাজার টাকা খরচ করে বোরো আবাদ করেছিলেন। কিন্তু নোনাপানিতে সব ধান মারা গেছে।

একই অভিযোগ এ এলাকার ইসমাইল শেখ, আব্দুর রাজ্জাক শেখসহ বেশ কয়েকজন কৃষকের।

উপজেলার আটলিয়া ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রতাপ কুমার রায় বলেন, নোনাপানি তোলার বিরুদ্ধে গ্রামবাসী স্থানীয় এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনওসহ সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। ফসলরক্ষায় নোনাপানির চিংড়ি চাষ বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করেছিলেন। কিন্তু কিছুতেই প্রতিকার পাননি কৃষকরা।

ডুমুরিয়া পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে বা স্লুইস গেট দিয়ে নোনাপানি ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষের কারণে অনেক বোরো ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইনসাদ ইবনে আমিন বলেন, ডুমুরিয়ার বোরোচাষিরা এবার ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে বা স্লুইস গেট দিয়ে নোনাপানি তুলে চিংড়ি চাষ অবৈধ। এ ক্ষেত্রে পাউবো ও স্থানীয় প্রশাসনের জোরালো ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।

ইউএনও শরীফ হাসিব রহমান বলেন, নোনাপানির চিংড়ি চাষের ফলে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে গত সপ্তাহে নোনাপানি তোলা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।