মানুষ কেন ইবাদতে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে

মানুষ যখন ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা থেকে দূরে সরে যায়, তখন সে সাধারণত দুটি প্রান্তিক অবস্থার একটিতে পতিত হয়—অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি, যা তাকে নিঃশেষ করে দেয়; অথবা শৈথিল্য, যা তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

মানুষের জীবনে ওঠানামা থাকাটাই স্বাভাবিক। কখনো সে অত্যন্ত উদ্যমী থাকে, আবার কখনো নিস্তেজ হয়ে পড়ে। কখনো ইবাদত-বন্দেগির প্রতি তার প্রবল আগ্রহ থাকে, আবার কখনো সে তা থেকে দূরে সরে যায়। কখনো প্রচণ্ড আনন্দিত হয়, আবার কখনো গভীর দুঃখে নিমজ্জিত হয়। কখনো কাউকে অতিরিক্ত ভালোবাসে, আবার কখনো অতিরিক্ত ঘৃণা করে।

এ ধরনের অবস্থা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হৃদয়ের অসুস্থতার প্রমাণ নয়; বরং এটি আরো সূক্ষ্ম একটি বিষয়ের ইঙ্গিত দেয়। আর তা হলো, জীবনের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা। ভারসাম্য কোনো সহজাত বিষয় নয়; বরং এটি একটি মানসিক ও ঈমানি দক্ষতা, যা বুঝতে হয় এবং যত্নের সঙ্গে লালন করতে হয়। এ কারণেই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতি সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অতিমাত্রায় অস্থিরচিত্ত করে।

যখন তাকে বিপদ স্পর্শ করে, তখন সে হয়ে পড়ে অতিশয় উৎকণ্ঠিত। আর যখন তাকে কল্যাণ স্পর্শ করে, তখন সে হয়ে পড়ে অত্যন্ত কৃপণ।’ (সুরা : আল-মাআরিজ, আয়াত : ১৯-২১) মানুষের মন স্বভাবগতভাবেই আবেগ ও প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে। সে কখনো অতিরিক্ত ভয় পায়, আবার কখনো অতিরিক্ত আনন্দিত হয়। তাই তার জন্য এমন একটি জীবনপদ্ধতি প্রয়োজন, যা তার আবেগ ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে।

আর সেই জীবনপদ্ধতিই হলো ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন। মানুষ কেন তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে—

১. নিজের স্বভাব ও মনের প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতা : অনেক যুবক মনে করে, তার আবেগ সব সময় একই রকম থাকতে হবে এবং তাকে সর্বদা কর্মচঞ্চল থাকতে হবে। ফলে ইবাদতে কিছুটা শিথিলতা এলে সে নিজেকে মোনাফিক মনে করে। আবার মন খারাপ হলে মনে করে, তার ঈমান দুর্বল হয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে সাহাবি হানজালা (রা.)-এর ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে। একবার হানজালা (রা.) আবু বকর (রা.)-এর সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘হানজালা মোনাফিক হয়ে গেছে!’

কারণ তিনি যখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্যে থাকতেন, তখন তাঁর ঈমানি অনুভূতি অনেক উঁচু পর্যায়ে থাকত। কিন্তু সেখান থেকে ফিরে পরিবার-পরিজন ও সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে সেই অনুভূতি কিছুটা কমে যেত। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ওই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! তোমরা যদি আমার কাছে থাকা অবস্থার মতো সর্বদা একই অবস্থায় থাকতে এবং সর্বদা জিকিরে মশগুল থাকতে, তাহলে ফেরেশতারা তোমাদের বিছানায় এবং চলার পথে তোমাদের সঙ্গে মুসাফাহা করত। কিন্তু হে হানজালা! কিছু সময় এ রকম, আর কিছু সময় সে রকম।’

তিনি কথাটি তিনবার বলেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭৫০; তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৪)

সুতরাং যে ব্যক্তি নিজের আবেগ ও অনুভূতির স্বাভাবিক পরিবর্তন সম্পর্কে জানে না, সে নিজেকেই বারবার দোষারোপ করতে শুরু করে। এরপর হতাশা আসে, একসময় সে ভালো কাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। এভাবেই সে মানসিক ও আত্মিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।

২. অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ও কঠোরতা : মানুষ যখন নিজের ওপর এমন কিছু দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়, যা বহন করার সামর্থ্য তার নেই, তখন সে ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই দ্বিন সহজ। যে ব্যক্তি দ্বিনের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করবে, দ্বিন তাকে পরাভূত করবে। অতএব তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন করো, যথাসম্ভব পরিপূর্ণতার কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করো এবং সুসংবাদ গ্রহণ করো। সহজ পদ্ধতি অবলম্বন করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৯)

যুবকদের জীবনে দ্বিন থেকে দূরে সরে যাওয়ার অনেক ঘটনার শুরু হয় অসামঞ্জস্যপূর্ণ আবেগ ও অতিরিক্ত উদ্দীপনা দিয়ে। কারণ অতিরিক্ত কঠোরতা মানুষকে দীর্ঘস্থায়ী করে না; বরং একসময় তাকে সম্পূর্ণভাবে থামিয়ে দেয়।

৩. কাজের চাপ ও অন্যের সঙ্গে অতিরিক্ত তুলনা : পড়াশোনা, চাকরি, বিভিন্ন সংবাদ, মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অন্যের সাফল্যের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা—এসব বিষয় মানুষের মনে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। একজন যুবক নিজের জীবনকে অন্যের জীবনের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করে। অথচ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা অনেক আগেই এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন, ‘আর আপনি কখনো আপনার চোখ প্রসারিত করবেন না সেসব বস্তুর প্রতি, যা আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণিকে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ ভোগ করতে দিয়েছি।’ (সুরা : আল-হিজর, আয়াত : ৮৮)

কারণ অবিরাম তুলনা মানুষের মধ্যে দুটি বিপজ্জনক অনুভূতি তৈরি করে—নিজেকে তুচ্ছ মনে করা অথবা অন্যের প্রতি হিংসা পোষণ করা। এ দুটি বিষয়ই মানুষের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে দেয়। এ কারণে রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করতেন—হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার দেওয়া রিজিকের ওপর সন্তুষ্ট রাখুন, তাতে বরকত দান করুন এবং আমার কাছ থেকে যা হারিয়ে গেছে, তার পরিবর্তে উত্তম কিছু দান করুন।’ (মুসতাদরাক হাকিম, হাদিস : ১৯০২)

প্রকৃতপক্ষে অল্পে তুষ্ট থাকা উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাব নয়; বরং এটি মানসিক প্রশান্তি ও ভারসাম্য অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।

৪. শারীরিক যত্নের প্রতি অবহেলা : পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, দীর্ঘ রাত জাগা এবং অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস—এসব বিষয় মানুষের মধ্যে বিরক্তি, মানসিক অস্থিরতা ও ইবাদতে অনীহা সৃষ্টি করতে পারে। ইসলাম চায়, একজন মানুষ আত্মা, শরীর ও মন—সব দিক থেকেই শক্তিশালী হোক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম এবং আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৭৯)

৫. ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি : যখন কোনো ব্যক্তি কিংবা পার্থিব বিষয় মানুষের সুখের একমাত্র উৎস হয়ে ওঠে, তখন সেই ব্যক্তি বা বস্তু হারিয়ে গেলে তার ভেতরের জগৎ ভেঙে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার প্রিয়জনকে পরিমিতভাবে ভালোবাসো, হতে পারে কোনো একদিন সে তোমার অপ্রিয় হয়ে যাবে। আর তোমার অপ্রিয় ব্যক্তিকে পরিমিতভাবে অপছন্দ করো, হতে পারে কোনো একদিন সে তোমার প্রিয় হয়ে যাবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৯৭; আল আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ১৩২১)

কারণ আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে সামান্য বিচ্ছেদ বা ক্ষতিও তার মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।

৬. গোপন পাপ ও গুনাহে লিপ্ত থাকা : মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন হবে সংকুচিত ও কষ্টময়।’ (সুরা : ত্ব-হা, হাদিস : ১২৪)

গুনাহ অনেক সময় মানুষকে এক মুহূর্তে ধ্বংস করে দেয় না; বরং ধীরে ধীরে তার অন্তর থেকে প্রশান্তি কেড়ে নেয়। ফলে সে অল্পতেই রেগে যায়, সামান্যতেই দুঃখ পায় এবং ধৈর্য ধারণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এভাবেই একসময় তার জীবনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।