স্বাস্থ্যসম্মত ও ভিন্ন স্বাদে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ব্র্যান্ডের সেমাইদেশে দুই ঈদ ঘিরেই সেমাইয়ের বিপুল চাহিদা থাকে। বিশেষ করে রোজার ঈদে মিষ্টান্ন হিসেবে এবং অতিথি আপ্যায়নে সেমাইয়ের বিকল্প নেই। তাই বাংলাদেশে সারা বছরই সেমাইয়ের যে পরিমাণ বেচাকেনা হয়, এর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি হয় ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায়। তবে ঘরে ঘরে সেমাই খাওয়ার রেওয়াজ তেমনভাবে না বদলালেও বদলেছে এর বাণিজ্যিক ধরন।
হাতে তৈরি খোলা সেমাইয়ের কদর অনেক কমে গেছে। সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে দেশের শিল্পগোষ্ঠীগুলোর প্যাকেটজাত ব্র্যান্ডের লাচ্ছা ও স্পেশাল সেমাই। বড় বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি, গুণগত মান ও ভিন্ন স্বাদের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের সেমাই এখন গ্রাহক চাহিদার শীর্ষে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সেমাই এখন রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশে। এদিকে দেশের বড় শিল্প গ্রুপগুলো সেমাই তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়ানোয় ছোট বেকারি বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা এ বাজার ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।
উদ্যোক্তারা বলছেন, বছরজুড়ে সেমাইয়ের উৎপাদন ও বেচাকেনার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা হিসাব না থাকলেও এ খাতের উদ্যোক্তারা ধারণা করছেন, দেশে বছরে সেমাইয়ের চাহিদা প্রায় ৩০ হাজার টন, যার মধ্যে ২০ হাজার টন উৎপাদিত হয় দুই ঈদ ঘিরে এবং যার বাজারমূল্যে হাজার কোটি টাকা; যেখানে বাজারে অর্ধেকের বেশি সেমাই সরবরাহ করে প্যাকেটজাত ব্র্যান্ডগুলো। দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির কারণে বাজারে প্যাকেটজাত সেমাইয়ের প্রতি আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সেমাইয়ের বাজার মোটাদাগে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত। এগুলো হলো সাধারণ বেকারির তৈরি, ছোট ছোট অঞ্চল বা এলাকাভিত্তিক ব্র্যান্ড এবং প্রতিষ্ঠিত বড় কম্পানির কারখানায় উৎপাদিত সেমাই। সাধারণ বেকারির মধ্যে আবার বেশির ভাগ শুধু ঈদকেন্দ্রিক। অঞ্চলভিত্তিক জনপ্রিয় ব্র্যান্ডও রয়েছে। তবে বর্তমানে দেশে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর প্যাকেটজাত ব্র্যান্ডের সেমাইয়ের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। বনফুল, প্রাণ, কুলসন, এসিআই, বিডিফুড, বসুন্ধরা, ড্যানিশ, রোমানিয়া, কোকোলা, কিষোয়ান ও ওয়েল ফুড দেশে তৈরি সেমাইয়ের বড় ব্র্যান্ড। প্যাকেটজাত সেমাই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই বাংলাদেশ অটো-বিস্কুট অ্যান্ড ব্রেড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। সংগঠনটির সভাপতি শফিকুর রহমান ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশে প্রায় ৪০টির মতো কম্পানি রয়েছে, যারা মানসম্মত ব্র্যান্ডের সেমাই উৎপাদন করে বাজারজাত করছে। এখন দেশের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পরিবার ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত সেমাই খাচ্ছে। বাকিরা স্থানীয় নন-ব্র্যান্ডের বা খোলা সেমাই খাচ্ছে। তবে দিন দিন ব্র্যান্ডের সেমাইয়ের চাহিদা বাড়ছে। কারণ এখন লাচ্ছা সেমাইয়ের সঙ্গে বিভিন্ন উপকরণ মিশিয়ে স্বাদের ভিন্নতা নিয়ে আসছে ব্র্যান্ড কম্পানিগুলো। বাজারে এখন অনেক কম্পানির লাচ্ছা সেমাই এক কেজির প্যাকেট চার হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু বাজারে খোলা এক কেজির সেমাই ১০০ টাকার মধ্যেও পাওয়া যাচ্ছে। ব্র্যান্ডের সেমাই গুণগত মানসম্মত হওয়ার কারণে এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানিও হচ্ছে।’
সেমাইয়ে বিভিন্ন উপকরণ মেশানোর কারণে অনেক সময় সেমাইয়ের মান ঠিক থাকছে না—এমন মন্তব্যে শফিকুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘সেমাইয়ের কোয়ালিটিতে এখন নানা ধরনের বৈচিত্র্য আনা হয়েছে। সেমাইয়ে ঘি, জাফরান, পেস্তা বাদামসহ বিভিন্ন উপকরণ মেশানোর কারণে স্বাদেও ভিন্নতা এসেছে। কিন্তু সেমাইয়ের মান ঠিক থাকছে না—ব্র্যান্ডের সেমাইয়ের ক্ষেত্রে এমন কোনো অভিযোগ আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি।’
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ও সুপারশপগুলো ঘুরে দেখা গেছে, মূল্যস্ফীতির প্রভাব সেমাইয়ের বাজারেও পড়েছে। প্রায় সব ধরনের সেমাইয়ের দাম বেড়েছে। বনফুল ব্র্যান্ডের ২০০ গ্রাম প্যাকেটের লাচ্ছা সেমাই ৫০ টাকায় এবং বনফুল ৮০০ গ্রাম প্যাকেটের স্পেশাল লাচ্ছা সেমাই ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বম্বে সুইট লাচ্ছা সেমাই ২০০ গ্রাম প্যাকেট ৫০ টাকা, বিডি ফুডের ২০০ গ্রাম লাচ্ছা সেমাই প্যাকেট ৫০ টাকা, ওয়েল ফুড প্যাকেট লাচ্ছা সেমাই ২০০ গ্রাম ৮৫ টাকা, ওয়েল ফুড ৪০০ গ্রাম প্যাকেট লাচ্ছা সেমাই ১৫০ টাকা, বসুন্ধরা লাচ্ছা সেমাই ২০০ গ্রাম প্যাকেট ৫৫ টাকা, ডেন ফুড ২৫০ গ্রাম প্যাকেট লাচ্ছা সেমাই ২০০ টাকা, এসিআই পিউর ১৫০ গ্রাম প্যাকেট লাচ্ছা সেমাই ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।





