গোপনে ইবাদত করার গুরুত্ত্ব ও তাত্পর্য

গোপন নেক আমল হলো লোকচক্ষুর আড়ালে, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিভৃতে সম্পন্ন করা নফল ও পুণ্যকর্ম। এটি ইখলাস বা নিষ্ঠা বৃদ্ধি করে এবং কবুল হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রাখে। রাতের নামাজ, গোপন দান, জিকির, কোরআন তিলাওয়াত এবং মানুষের কষ্ট লাঘবে গোপনে সহায়তা করা এগুলো আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয় ও শক্তিশালী আমল। গোপন ইবাদত সওয়াবের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা হওয়ার জন্য গোপন ইবাদতে অভ্যস্ত হওয়া অবশ্যক। নিম্নে গোপন ইবাদতের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলো—

ইখলাস ও বিশুদ্ধ নিয়ত গঠন

গোপন ইবাদত মুমিনের নিয়তকে বিশুদ্ধ করে। যখন কেউ নির্জনে কেবল আল্লাহর জন্য সিজদাবনত হয় বা দান-সদকা করে, তখন তার অন্তরে সৃষ্টির প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে না। এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই বান্দাকে আল্লাহর সবচেয়ে কাছে নিয়ে যায়।

গভীর ঈমানের পরিচায়ক

গভীর ও একনিষ্ঠ ঈমানের একটি বড় নিদর্শন হলো গোপনে ইবাদত করা। কারো গোপন নেক আমল যখন বেড়ে যায়, তখন তিনি ঈমানের সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত হতে পারেন। আর ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর হচ্ছে ‘ইহসান’। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইহসান হচ্ছে তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছ; যদি তাঁকে দেখতে না পাও তবে বিশ্বাস রাখবে তিনি তোমাকে দেখছেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫০)

আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়

অন্তরে ঈমান ও আল্লাহর ভয় যত শক্তিশালী হয়, নেক আমলের বৃক্ষ তত বেশি ফলবতী হয়।যার গোপন ইবাদত যত সুন্দর হয়, তার বাহ্যিক আমলগুলো তত পরিপাটি হয়। এ জন্য মহান আল্লাহ গোপন ইবাদত অত্যধিক পছন্দ করেন। তিনি বান্দাকে সঙ্গোপনে দোয়া করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবকে ডাকো বিনীতভাবে ও চুপে চুপে। নিশ্চয়ই তিনি সীমা লঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৫)

রিয়া বা লোকদেখানো মানসিকতা থেকে মুক্তি

ইবাদতের সওয়াব বিনষ্ট হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছা। প্রকাশ্য ইবাদতে অনেক সময় অবচেতনভাবেই মানুষের প্রশংসা পাওয়ার ইচ্ছা জাগতে পারে। গোপন ইবাদত এই রোগ থেকে অন্তরকে হেফাজত করে। সে জন্য ইবাদত যখন রিয়ামুক্ত হয়, তখন সেটা খাঁটি ও কবুলযোগ্য হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান করো, তবে তা কতই না উত্তম! আর যদি তা গোপনে করো এবং অভাবীদের প্রদান করো, তাহলে তোমাদের জন্য সেটাই উত্তম। (এর দ্বারা) তিনি তোমাদের কিছু পাপ মোচন করে দেবেন। আর তোমরা যা কিছু করো, আল্লাহ তার খবর রাখেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭১)
অন্তরের শুদ্ধতা অর্জন
সঙ্গোপনে ইবাদতের মাধ্যমে যে তৃপ্তি পাওয়া যায়, কারো সামনে ইবাদত করার সময় সেটা পাওয়া যায় না। হাশরের ময়দানে সবাই যখন দিশাহারা হয়ে যাবে, তখন তারা আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে প্রশান্ত চিত্তে। মহান আল্লাহ বলেন : ‘যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না, কেবল যে ব্যক্তি বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে, সে ছাড়া। (সেদিন) জান্নাতকে আল্লাহভীরুদের নিকটবর্তী করা হবে।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ৮৮-৯০)

আল্লাহর আরশের ছায়া লাভ

কিয়ামতের ময়দানে মহান আল্লাহ যে সাত শ্রেণির বান্দাকে ছায়া দান করবেন, তার মধ্যে তিন শ্রেণির লোক হবে গোপন আমলকারী। যেমন—নবী কারিম (সা.) বলেন, সেদিন সাত শ্রেণির ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাঁর (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, যেদিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না।…(তন্মধ্যে অন্যতম হলো) ওই ব্যক্তি, যাকে কোনো উচ্চ বংশীয় রূপসী নারী আহ্বান জানায়, কিন্তু সে এই বলে প্রত্যাখ্যান করে যে ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি।’
আর সেই ব্যক্তি ছায়া পাবে, যে এমন গোপনে দান করে যে তার ডান হাত কি ব্যয় করে বাঁ হাত সেটা জানতে পারে না। অতঃপর সে ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে; ফলে তার দুই চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয়। (বুখারি, হাদিস : ৬৬০)

গোপন নেক আমলের কিছু উদাহরণ
কোরআন তিলাওয়াত, জ্ঞান অর্জন, অন্যকে সাহায্য করা, গোপনে দান করা, রাতের নামাজ তাহাজ্জুদ আদায় করা, আত্মীয়ের খোঁজ নেওয়া ও সেবা করা ইত্যাদি।
গোপন আমলে উত্সাহিত করার মানে এই নয় যে প্রকাশ্যে নেক আমল করা যাবে না। তবে গোপন আমল উত্তম ও ওই আমলে ইখলাস বা একাগ্রতা থাকে বেশি। তাই ফরজ আমল প্রকাশ্যে আর নফল আমল গোপনে করা উত্তম। আর কিছু আমল একান্ত গোপন রাখাই ভালো। হতে পারে, সেই আমলের কারণে মহান আল্লাহ খুশি হয়ে যাবেন। আর তিনি খুশি হওয়া মানেই বান্দা সফল।