মনে করা হয়েছিল, কয়েক মাসের টানা যুদ্ধ এবং কঠোর নৌ-অবরোধে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে প্রায় পঙ্গু হয়ে পড়েছে। পারস্য উপসাগরের তলদেশে তলিয়ে গেছে দেশটির নৌবাহিনী, ধ্বংস হয়েছে বিমানবাহিনী এবং পুরো অর্থনীতি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের ধুলোবালি ও ক্ষত যখন মুছে যেতে শুরু করেছে, তখন এক অদ্ভুত সমীকরণ সামনে আসছে। চলমান এই যুদ্ধ শুরুর আগের চেয়েও হয়তো আরও শক্তিশালী ও সুবিধাজনক অর্থনৈতিক অবস্থানে গিয়ে পৌঁছাতে পারে ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) যদি সত্যি কার্যকর হয়, তবে তা ইরানের জন্য একটি বড় জ্যাকপট হতে পারে। এই চুক্তির আওতায় বিশ্বজুড়ে আটকে থাকা ইরানের বিশাল অঙ্কের সম্পদ যেমন অবমুক্ত করা হবে, তেমনি দেশটির ওপর থেকে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিপুল পরিমাণ নগদ বিনিয়োগের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মুক্তভাবে তেল বিক্রির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
এই চুক্তির সবচেয়ে বড় এবং তাৎক্ষণিক সুফল হলো ইরানের আয়ের মূল উৎস তথা তেল বিক্রির পথ আবার উন্মুক্ত হওয়া। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় ইরান এখন তেল ট্যাংকারে ভাসমান অবস্থায় থাকা কোটি কোটি ব্যারেল তেল কোনোরকম বাধা ছাড়াই বিক্রি করতে পারবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশটি এখন দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল রফতানি করতে সক্ষম হবে, যা যুদ্ধপূর্ব সময়ের চেয়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি। তা ছাড়া এত দিন কালোবাজারে চড়া ছাড়ে তেল বিক্রি করতে হলেও, এখন থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বৈধভাবে সম্পূর্ণ মূল্যে তেল বিক্রি করতে পারবে তেহরান। গত কয়েক মাস ধরে মার্কিন ব্লকেড বা অবরোধের কারণে পারস্য উপসাগর থেকে ইরানের তেল রফতানি সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। তবে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে অবরোধ তুলে নেওয়ার পর ইতোমধ্যেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৩৮ লাখ ব্যারেল তেল সফলভাবে রফতানি করেছে ইরান।
তেল বিক্রির পাশাপাশি আরেকটি বড় স্বস্তি আসছে জব্দ হওয়া অর্থ ফেরত পাওয়ার মাধ্যমে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ব্যাংকে ইরানের প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ আটকে আছে, যা দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, এই বৈশ্বিক তহবিলের পরিমাণ ১২৪ থেকে ১৬৭ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা যুদ্ধপূর্ব ইরানের বার্ষিক অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। তবে মার্কিন প্রশাসন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ইরান তাদের প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি রক্ষা না করা পর্যন্ত এই তহবিলের একটি ডলারও ছাড় করা হবে না।
এর বাইরে যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য একটি ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে এই চুক্তিতে। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের ইস্পাত ও পেট্রোকেমিক্যাল কারখানাসহ বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে, যার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলার বলে দাবি করেছে তেহরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জি-৭ বৈঠকে জানিয়েছেন যে, এই তহবিলটি মার্কিন করদাতাদের টাকায় নয়, বরং বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নে গঠিত হবে। তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইরানের আচরণ না দেখে এখনই সেখানে বিনিয়োগ করতে কতটা আগ্রহী হবেন, তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে ইরানের ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববাজারের সঙ্গে সরাসরি লেনদেন করতে পারবে। যদিও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের ভয়ে অনেক বিদেশি ব্যাংক এখনই ঝুঁকি নিতে চাইবে না, তবু এই চুক্তিটি মার্কিন নীতির গত পাঁচ দশকের ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন জোর দিয়ে বলেছে, ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধসহ সমস্ত শর্ত মেনে চলতে হবে, অন্যথায় নিষেধাজ্ঞা আবার ফিরে আসবে।
সব মিলিয়ে চুক্তিটি যদি সত্যি টিকে থাকে, তবে তা ইরানের আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি ও খাদ্যপণ্যের দাম কমাতে সাহায্য করবে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইরানের মূল সমস্যা কেবল নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা। ফলে এই বিশাল অর্থ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কতটা কাজে লাগবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েই যাচ্ছে।





