জাপানের বিপক্ষে ম্যাচের আগে বর্ণবাদ নিয়ে ভিনির বার্তা

ব্রাজিলের আক্রমণভাগে গতি, ড্রিবলিং আর দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ের জন্য পরিচিত ভিনিসিয়াস জুনিয়র। এবারের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচ শেষে ভিনির নামের পাশে শোভা পাচ্ছে ৪টি গোল। অতীতে যেসব ব্রাজিলিয়ান তারকা বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের তিন ম্যাচেই গোল করেছিলেন, তাদের প্রায় সবাই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছেন। ফলে ব্রাজিল সমর্থকদের স্বপ্ন আরও বড় হচ্ছে।

সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে রাউন্ড অব ৩২ এ জাপানের মুখোমুখি হচ্ছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তবে হাইভোল্টেজ ম্যাচটির আগে ব্রাজিলের সম্প্রচারমাধ্যম ‘গ্লোবো টিভি’-কে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। এতে নিজের ব্যক্তিগত জীবনসংগ্রাম, দাদির সঙ্গে গভীর আবেগঘন সম্পর্ক এবং ফুটবলে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে চলমান লড়াই নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। পাশাপাশি তিনি তার বিশ্বকাপ স্বপ্ন ও ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য মাইলফলক নিয়েও কথা বলেছেন।

এই ব্রাজিলিয়ান তারকা তার বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে দাদির ভূমিকার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন এবং তাকে নিজের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করেন। গ্লোবো টিভিকে তিনি বলেন, আমার জীবনে দাদি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত আমি তার সঙ্গেই ছিলাম। কথা বলা শেখার সময় থেকেই আমি জানতাম যে তিনিই আমার সব।

রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা দাদির সঙ্গে একটি ছোট বাড়িতে বেড়ে ওঠার স্মৃতি এবং শৈশবে তার কাছ থেকে পাওয়া অকুন্ঠ সমর্থনের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, আমার কাছে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ, কারণ আমার বাবা সবসময় দূরে থাকতেন। তাই মা ও ভাইবোনদের পাশাপাশি দাদিই ছিলেন আমার প্রধান অবলম্বন; তিনিই সবকিছুর দেখভাল করতেন। বাড়িটা খুব ছোট ছিল; আমি তার সঙ্গেই ঘুমাতাম। আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তিনি এমন একজন মানুষ যিনি আমার জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন।

এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড বলেন, মাঠের বাইরের কাজ বা প্রভাব মাঠের সাফল্যের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভিনি বলেন, মাঠের বাইরের এই অর্জনগুলো মাঠের সাফল্যের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে আমি অনেক বেশি মানুষের সহায়তা করতে পারি।

ভিনিসিয়াস জুনিয়র বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার এবং নিজের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার দৃঢ় প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেন। ফুটবলে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে সোচ্চার কণ্ঠস্বরগুলোর মধ্যে ভিনিসিয়াস অন্যতম।

রিয়াল মাদ্রিদে খেলার সময় তিনি ইউরোপের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে বারবার বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার জেরে তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং খেলাটিতে বর্ণবাদ মোকাবিলার বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই ইতিবাচক পরিবর্তন অব্যাহত থাকুক, যাতে পরবর্তী প্রজন্মকে বর্ণবাদের শিকার হতে না হয়। আমি মাঠের ভেতরে যেমন দারুণ সব কাজ করে যেতে চাই, তেমনি তরুণদের অনুপ্রাণিত করতে চাই এবং সেইসব কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের হয়ে লড়াই করতে চাই যাদের আমার মতো কথা বলার সুযোগ বা কণ্ঠস্বর নেই।

ফিফা বিশ্বকাপে নিজের যাত্রার কথা বলতে গিয়ে ২৫ বছর বয়সী এই তারকা ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ব্রাজিলের প্রতিনিধিত্ব করতে পারায় গর্ব প্রকাশ করেন। টুর্নামেন্টের চলমান ২৩তম আসরে ভিনিসিয়াস এখন পর্যন্ত চারটি গোল করেছেন—যা কোনো ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়ের জন্য সর্বোচ্চ—এবং পাশাপাশি একটি গোলে সহায়তাও করেছেন।

ভিনি বলেন, বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন আমি সবসময়ই দেখেছি, আর এখন আমি আমার দ্বিতীয় বিশ্বকাপে খেলছি। নিজের দেশের এবং এখানে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখা সেই সব খেলোয়াড়ের প্রতিনিধিত্ব করার চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না। বাইরে থেকে হয়তো বিষয়টিকে সহজ মনে হয়, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে চলা এক লড়াই।

গ্রুপ ‘সি’-তে শীর্ষস্থান অর্জনের মাধ্যমে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা টানা ১২টি বিশ্বকাপে নিজেদের গ্রুপে সবার ওপরে থাকার অসাধারণ রেকর্ডটি আরও দীর্ঘায়িত করল। ১৯৮২ সাল থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপেই তারা নিজ গ্রুপে শীর্ষস্থান দখল করে আসছে, যার ফলে গ্রুপ-পর্বে তাদের আধিপত্যের ৪৪ বছরের এক অনন্য ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।