বাংলা সংগীতের ইতিহাসে যাঁর কণ্ঠ এক অনন্য অধ্যায় তৈরি করেছে, তিনি কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী। আজ তাঁর জন্মদিন। ১৯৪০ সালের এই দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ৮৬তম জন্মদিনে ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভালোবাসায় সিক্ত হচ্ছেন এই গুণী শিল্পী।
বাংলা চলচ্চিত্র ও আধুনিক গানের ভুবনে সৈয়দ আব্দুল হাদী এমন এক নাম, যাঁর কণ্ঠ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আবেগে ভাসিয়েছে। গভীর অনুভূতিময় গায়কী, স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর এবং গানের প্রতি নিষ্ঠা তাঁকে বাংলা সংগীতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে। সময়ের সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল তাঁর। পরিবারের সংগীতমনা পরিবেশ বিশেষ করে বাবার গ্রামোফোনে গান শোনার অভ্যাস তাঁকে ছোটবেলাতেই সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট করে। পরবর্তীতে সেই ভালোবাসাই ধীরে ধীরে পরিণত হয় জীবনের অন্যতম প্রধান সাধনায়।
শিক্ষাজীবনে তিনি পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই সংগীতচর্চার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও গভীর হয়। ধীরে ধীরে তিনি যুক্ত হন চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক জগতে এবং গড়ে তোলেন নিজের শক্ত অবস্থান।
১৯৬৪ সালে ‘ডাকবাবু’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি পূর্ণাঙ্গ প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর কণ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্র সংগীতে এক নতুন ধারা তৈরি করে। আবেগঘন, মর্মস্পর্শী ও গভীর অর্থবোধক গায়কীর কারণে তিনি দ্রুতই শ্রোতাপ্রিয়তা অর্জন করেন।
তাঁর কণ্ঠে গাওয়া অসংখ্য গান বাংলা সংগীতের ইতিহাসে আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। ‘সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি’, ‘একবার যদি কেউ ভালোবাসতো’, ‘এই পৃথিবীর পান্থশালায়’, ‘যেও না সাথী’, ‘আছেন আমার মোক্তার, আছেন আমার বারিস্টার’, ‘আমি তোমারই প্রেম ভিখারী’—এমন বহু কালজয়ী গান তাঁকে দিয়েছে এক অনন্য পরিচিতি।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া ২০০০ সালে তিনি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত হন। পরবর্তী সময়ে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তাঁর অবদান বিভিন্নভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে সৈয়দ আব্দুল হাদী শুধু একজন সফল শিল্পীই নন, বরং বাংলা গানের এক শক্তিশালী স্তম্ভ। তাঁর কণ্ঠে ফুটে ওঠা জীবনবোধ, ভালোবাসা ও বিচ্ছেদের সুর আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর গান শুনে আবেগিত হয়, যা তাঁকে বাংলা সংগীতের ইতিহাসে চিরস্থায়ী আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।





