বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর যৌথভাবে একটি ‘সেবা মাশুল’ বা শুল্ক আরোপের চূড়ান্ত পরিকল্পনা করছে ইরান ও ওমান।
এই বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি ও কঠোর সামরিক হুমকি থাকা সত্ত্বেও দেশ দুটি তাদের নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থেকে এই বড় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বলে মঙ্গলবার এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে তথ্য প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস।
একজন শীর্ষস্থানীয় ইরানি সরকারি কর্মকর্তা এবং চারজন আন্তর্জাতিক কূটনীতিকের দেওয়া গোপন সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
চলতি জুলাই মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ১৪ দফার একটি সমঝোতা চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, আগামী ৬০ দিনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলাকালীন হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো ধরনের মাশুল বা টোল ছাড়াই সব বাণিজ্যিক জাহাজ সম্পূর্ণ নিরাপদে চলাচল করতে পারবে। তবে ওই বিশেষ চুক্তির একটি গোপন অংশ হিসেবেই দীর্ঘমেয়াদে একটি যৌথ বাণিজ্যিক পরিকল্পনা তৈরি করার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে ইরান ও ওমানের ওপর।
মূলত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ-পরবর্তী আঞ্চলিক বাণিজ্যিক মডেলের অংশ হিসেবেই এই টোল বা শুল্ক আদায়ের নতুন পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা মূলত বিশ্বজুড়ে শত শত বছর ধরে চলে আসা মুক্ত ও স্বাধীন নৌ-চলাচলের প্রচলিত আন্তর্জাতিক নিয়মের সম্পূর্ণ বিপরীত।
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ওমান রাষ্ট্রীয়ভাবে চাইছে এই শুল্ক বা মাশুলের বিষয়টি যেন আপাতত ‘ঐচ্ছিক’ রাখা হয়, কিন্তু ইরান এটিকে যেকোনো মূল্যে সবার জন্য ‘বাধ্যতামূলক’ করার ব্যাপারে অত্যন্ত অনড় অবস্থান নিয়েছে। ওমানের রাজধানী মাস্কাটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নিরাপদ নৌ-চলাচল ও নৌ-নিরাপত্তা বজায় রাখার বিশাল খরচ মেটাতেই মূলত এই অর্থ ব্যবহার করতে চায় তারা, যার সাথে মালাক্কা বা সিঙ্গাপুর প্রণালীর বর্তমান শাসন ব্যবস্থার যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে।
তবে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত সোমবার এক স্পষ্ট ও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ওমানের সঙ্গে যদি শেষ পর্যন্ত কোনো যৌথ চুক্তি সম্পন্ন না-ও হয়, তবে তেহরান সম্পূর্ণ একতরফাভাবেই এই প্রণালিতে শুল্ক আরোপের কাজ শুরু করবে। মূলত ইরানের এমন চরম একতরফা ও বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত এড়াতেই ওমান মাঝখানে থেকে একটি মধ্যপন্থা বা বিকল্প কূটনৈতিক উপায় খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে ওমানের এই সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে চরম ক্ষুব্ধ ও হিংস্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ওয়াশিংটন। গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওমানকে সরাসরি লক্ষ্য করে একপ্রকার নজিরবিহীন সামরিক হামলার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন। ট্রাম্প তখন সাফ জানিয়ে দেন, ইরান ও ওমান মিলে যদি হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের শুল্ক আরোপের ধৃষ্টতা দেখায়, তবে ওমানকে সামরিক শক্তি দিয়ে ‘উড়িয়ে দেওয়া’ হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতে, এই প্রণালিটি একটি আন্তর্জাতিক জলসীমা এবং এটি সবসময় সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, কেউ এককভাবে এর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন উগ্র ও যুদ্ধংদেহী মন্তব্যের পর ওমানের সাথে দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে মার্কিন কূটনীতিকদের বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের সঙ্গে এক গোপন বৈঠকে ওমানি কূটনীতিকরা আশ্বস্ত করেছিলেন যে, হরমুজ প্রণালিতে শুল্ক আরোপের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন কথা বলছে।





