পিয়ংইয়ংয়ে সম্প্রতি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের মধ্যে এক জমকালো শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রাখা হয়েছে। বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের নীতি থেকে এই সরে আসা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, উত্তর কোরিয়াকে পরমাণুমুক্ত করার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা সম্ভবত চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। পরমাণু অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের ওপর পরিচালিত সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্র ত্যাগ করার সম্ভাবনা মাত্র ৩ শতাংশ। গত তিন দশক ধরে চলা নানামুখী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পিয়ংইয়ং এখন প্রায় ৬০টি পরমাণু অস্ত্র এবং আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রের এক বিশাল ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে।
নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং কোরীয় যুদ্ধের কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তি না হওয়ায় তীব্র নিরাপত্তাহীনতা থেকে উত্তর কোরিয়া পরমাণু কর্মসূচির দিকে ঝুঁকে পড়ে। শুরুতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হলেও, পরবর্তীতে উত্তর কোরিয়ার চুক্তিভঙ্গ ও একের পর এক উসকানির মুখে জাতিসংঘ এবং আমেরিকা দেশটির ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তবে রাশিয়া ও চীনের পরোক্ষ সহযোগিতা, জাতিসংঘের নজরদারিতে ভেটো দিয়ে বাধা দান এবং পিয়ংইয়ংয়ের নিজস্ব হ্যাকার নেটওয়ার্ক, কূটনৈতিক তৎপরতা ও চোরাচালান চক্রের কারণে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো কখনোই পূর্ণ কার্যকারিতা পায়নি। ফলে দেশটির অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি এবং তারা নিজেদের পরমাণু সক্ষমতা বাড়িয়েই চলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য উত্তর কোরিয়ার সেনা ও অস্ত্র পাওয়ার বিনিময়ে রাশিয়াও এখন তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বা কোনো পূর্বশর্ত ছাড়া আলোচনায় বসে উত্তর কোরিয়াকে আর পরমাণুমুক্ত করা সম্ভব নয়। কারণ কিম শাসনব্যবস্থা তাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই এই পরমাণু সক্ষমতাকে মূল ঢাল হিসেবে বিবেচনা করে। এখন একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আমূল পরিবর্তন বা দুই কোরিয়ার একত্রীকরণ।
তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, সরাসরি নিরস্ত্রীকরণের পেছনে না ছুটে এখন মূলত সময়ক্ষেপণ কৌশলে যাওয়া উচিত। এর মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার ভেতরের নেতৃত্ব বা উত্তরসূরি নির্বাচন, অভিজাত শ্রেণির মধ্যকার ফাটল এবং আদর্শিক দুর্বলতাগুলো যাতে আরও প্রকট হওয়ার সুযোগ পায়, সেই অপেক্ষা করা দরকার। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত প্রকাশ্যে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের নীতি বজায় রাখা যাতে পিয়ংইয়ং একে বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, এবং পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হুমকি মোকাবিলায় আঞ্চলিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা।





