‘প্রতিটি সময় প্রতিটি মুহূর্তই বেদনার ও কষ্টের। তবে জুলাই এলেই বুকের মধ্যে তীব্র চাপা ক্ষোভ আর কষ্টে ভরে যায়। জুলাই মানেই বেদনার মাস। জুলাই এলেই আমার আর ভালো লাগে না। এই জুলাই মাসেই আমি হারায় আমার বুকের মানিক আমার কলিজার টুকরো সন্তানকে’- এমন আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন জুলাই আন্দোলনে গুলিতে নিহত মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সাগর আহমেদের মা গোলাপী বেগম।
সাগর আহমেদ রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়নের টাকাপোড়া গ্রামের তোফাজ্জেল হোসেনের ছেলে।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকেলে কথা হয় সাগরের বাবা-মা ও মামলার বাদি মো: সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। কথা বলার সময় সবার চোখেমুখেই ছিল বিষন্নতা ও হতাশার ছাপ। একদিকে ছেলে ও স্বজন হারানোর ব্যথা অন্যদিকে মামলার অগ্রগতি নিয়ে শঙ্কা। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ছেলে হারানোর বেদনা ভুলতে পারছেন না সাগরের বাবা-মা।
সাগরের মা গোলাপী বেগম জানান, আজ দুইটা বছর হয়ে গেল তার কোল খালি। মানুষ বলে সময় নাকি সব ভুলিয়ে দেয়, কিন্তু তার কাছে মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। প্রতিটা সেকেন্ডে প্রতিটা নি:শ্বাসে সে তার বুকের মানিক সাগরকে অনুভব করেন। সাগর শুধু তার কাছে ছেলে ছিল না, ছিল তার কলিজার টুকরো।
এ সময় তিনি সরকারের কাছে দাবি জানান নারুয়া লিয়াকত আলী স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের নাম পরিবর্তন করে এবং উপজেলা মডেল মসজিদটির নামকরণ সাগরের নামে করার। তাহলে অন্তত এই ভেবে সান্ত¡না পাবেন যে মানুষ প্রতিদিন তার ছেলের জন্য দোয়া করবে। তিনি চান- দেশের মানুষ ওকে মনে রাখুক, ওর স্মৃতি চিরকাল বেঁচে থাকুক।
সাগরের বাবা তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ছেলে হারানোর যে কী কষ্ট তা কেবল যে বাবা হারিয়েছে সেই জানেন। দুই বছর ধরে বুকে পাথর নিয়ে বেঁচে আছেন। সাগরের স্মৃতিগুলো তাকে প্রতি মুহূর্তে তাড়া করে বেড়ায়। ও যে দেশের জন্য, ন্যায়ের জন্য জীবন দিল-তার এই ত্যাগ যেন হারিয়ে না যায়।
মামলার বাদি সাগরের চাচাত ভাই সাইফুল ইসলাম বার্তা২৪.কমকে জানান, মামলাটি বর্তমানে সিআইডিতে রয়েছে। সাগরের মৃত্যুর দুইটা বছর পার হয়ে গেল। মামলার অগ্রগতি দেখে হতাশ তিনি। তিনি ভেবেছিল এই মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে রায় কার্যকর হবে।
তিনি সরকারের কাছে দাবি জানান, মামলার বিচার প্রক্রিয়া যেন ঝুলিয়ে রাখা না হয়। দ্রুত যেন শেষ করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়। এই রায়ের বাস্তবায়ন যেন তারা শীঘ্রই দেখতে পান। তারা সাগর হত্যার সুষ্ঠু বিচার চান।
মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক কৃঞ্চ দাস বার্তা২৪.কমকে জানান, অল্প সময় হলো মামলাটি থানা থেকে সিআইডিতে এসেছে। মামলাটিতে অনেক আসামি। আসামিদের অনেকেরই পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা নেই। আসামির নাম আছে কিন্তু পিতার নাম নেই, কারও আবার ঠিকানা নেই। সেগুলোর সংগ্রহের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে মামলার বাদিকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করার জন্য বলা হয়েছে এবং মামলার স্বাক্ষীদেরকে (যারা এখনো সাক্ষী দেননি) তাদেরকে উপস্থিত করার জন্য বলা হয়েছে। গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে মামলাটির তদন্ত কাজ করছেন।
উল্লেখ্য, কোটা সংস্কারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে ১৯ জুলাই মিরপুর গোলচত্বরে পুলিশের গুলিতে মারা যান সাগর আহমেদ (২১)। ২০ জুলাই গ্রামের বাড়িতে জানাযা শেষে বিল টাকাপোড়া কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন করা হয়।





