এক সময় বিশ্বকাপে জায়গা পেত ২৪টি দল, পরে ৩২, তারপর ৪৮। এখন আলোচনায় ৬৪ দলের বিশ্বকাপ। ফুটবলকে আরও বৈশ্বিক করার যুক্তি যেমন আছে, তেমনি প্রশ্নও কম নয়। বিশ্বকাপ কি আরও আকর্ষণীয় হবে, নাকি হারাবে তার প্রতিযোগিতামূলক তীব্রতা-সেই হিসাবই এখন কষছে ফুটবল বিশ্ব। বিশ্বকাপ কি সত্যিই আরও বড় হওয়া উচিত?
২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের পর এবার ফুটবল বিশ্বের সামনে নতুন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে ফিফা-দল বাড়িয়ে ৬৪ করা হবে কি না!
২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে স্পেনের শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে। তবে ট্রফি উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই ফুটবল বিশ্বে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের বিশ্বকাপ সফলভাবে আয়োজনের পর এবার আলোচনায় উঠে এসেছে আরও বড় এক পরিকল্পনা-বিশ্বকাপে ৬৪ দল। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সম্প্রসারণ কি সত্যিই ফুটবলের উন্নয়নের জন্য, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও বড় বাণিজ্যিক হিসাব?
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিশ্বকাপকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে। তার যুক্তি, ছোট দেশগুলোকে বিশ্বকাপে সুযোগ না দিলে তারা কখনো উন্নতির প্রেরণা পাবে না। ৪৮ দলের বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের মতো নতুন দল যেভাবে চমক দেখিয়েছে, সেটিকেই ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের বড় উদাহরণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
খাতাকলমে ৬৪ দলের বিশ্বকাপের কাঠামোও বেশ সহজ। ১৬টি গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলবে দলগুলো, প্রতিটি গ্রুপ থেকে দুটি করে দল উঠবে নকআউটে। এতে তৃতীয় হওয়া দলগুলোর জটিল হিসাব-নিকাশের প্রয়োজন থাকবে না। কিন্তু এই গাণিতিক সুবিধাই কি বিশ্বকাপকে আরও বড় করার যথেষ্ট কারণ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে ২০৩০ বিশ্বকাপের প্রেক্ষাপট। শতবর্ষ উদযাপনের আসরটি হবে ছয় দেশে-স্পেন, পর্তুগাল, মরক্কো, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে। সেই উপলক্ষেই দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল কনফেডারেশন (কনমেবল) এককালীন ৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা (উয়েফা), কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন-তিন পক্ষই এ পরিকল্পনা নিয়ে প্রকাশ্যে আপত্তি জানিয়েছে। তাদের মতে, এত বড় টুর্নামেন্ট বিশ্বকাপের প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
তবু পরিকল্পনাটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ফিফা কাউন্সিল। আর সেখানে ইনফান্তিনোর প্রভাব ও সমর্থনকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
বিশ্বকাপ সম্প্রসারণের পেছনে অর্থনীতিও বড় একটি বাস্তবতা। ৪৮ দলের বিশ্বকাপের মাধ্যমে ফিফার আয় প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। দল সংখ্যা ৬৪ হলে সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ ও টিকিট বিক্রি থেকে সেই আয় আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে ফিফার সদস্য দেশগুলোও আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নয়ন অনুদান পাচ্ছে। ফলে অর্থনৈতিক দিক থেকে সম্প্রসারণের পক্ষে সমর্থনও বাড়ছে।
তবে বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে প্রতিযোগিতার মান নিয়ে। ২০২৬ বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে প্রমাণ করেছে নতুন দল মানেই দুর্বল দল নয়। কিন্তু সম্ভাব্য ৬৪ দলের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অতিরিক্ত সুযোগ পাওয়া দেশগুলোর বেশিরভাগই ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে অনেক নিচে। সম্ভাব্য নতুন দলগুলোর মধ্যে মাত্র ছয়টি রয়েছে শীর্ষ ৫০-এর মধ্যে। ফলে অনেক ম্যাচ একপেশে হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এতে গ্রুপ পর্বের রোমাঞ্চও কমে যেতে পারে। অতীতে জার্মানি, ইতালি, স্পেন কিংবা ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী দলগুলো গ্রুপ থেকেই বিদায় নিয়ে যে নাটকীয়তা তৈরি করেছিল, দল বাড়লে সেই চমক হয়তো অনেকটাই হারিয়ে যাবে।
শুধু প্রতিযোগিতার মান নয়, বিশাল লজিস্টিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ৪৮ দলের বিশ্বকাপ শেষ হতে সময় লেগেছে ৩৯ দিন। ৬৪ দল হলে ম্যাচ বাড়বে আরও ২৪টি, ফলে টুর্নামেন্ট অন্তত পাঁচ দিন দীর্ঘ হবে। প্রয়োজন হবে আরও বেশি স্টেডিয়াম, ট্রেনিং সেন্টার, হোটেল, পরিবহন ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা অবকাঠামো।
আবহাওয়াও বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক ছাদঢাকা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়াম পরিস্থিতি সামাল দিতে সাহায্য করেছে। কিন্তু ভবিষ্যতের সব আয়োজক দেশের পক্ষে এমন অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে না। বিশেষ করে এশিয়া বা আফ্রিকার অনেক দেশের জন্য এটি হবে বিশাল আর্থিক চাপ।
৬৪ দলের বিশ্বকাপের আলোচনা এখন শুধু ফুটবল নয়, অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রতিযোগিতার মান এবং বৈশ্বিক ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও তুলে দিচ্ছে। আরও বেশি দেশের অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে বিশ্বকাপকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে। কিন্তু সেই সঙ্গে বিশ্বকাপের ঐতিহ্য, প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা এবং আয়োজনের সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখা যাবে কি না-সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন!





