বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা কিউবার বিপ্লবের সূচনা হয় ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই। এই দিনেই তরুণ আইনজীবী ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী কিউবার সান্তিয়াগো দে কিউবায় অবস্থিত মনকাদা ব্যারাকে হামলা চালান। সামরিকভাবে এই অভিযান ব্যর্থ হলেও এটিই পরবর্তীতে কিউবার বিপ্লবের ভিত্তি স্থাপন করে এবং দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
১৯৫২ সালে জেনারেল ফুলহেনসিও বাতিস্তা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। তার শাসনামলে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, দুর্নীতি এবং সামাজিক বৈষম্য বেড়ে যায়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ায় তরুণ নেতা ফিদেল কাস্ত্রো সশস্ত্র আন্দোলনের পথ বেছে নেন।
১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই প্রায় ১৬০ জন বিপ্লবীকে নিয়ে ফিদেল কাস্ত্রো মনকাদা ব্যারাকে হামলা চালান। পরিকল্পনার বিভিন্ন ত্রুটি ও প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে অভিযানটি সফল হয়নি। অনেক বিপ্লবী নিহত বা গ্রেপ্তার হন। ফিদেল কাস্ত্রোও আটক হন এবং আদালতে নিজের পক্ষে বিখ্যাত বক্তব্য দেন, যার শেষ অংশ ছিল—“ইতিহাস আমাকে মুক্তি দেবে”। এই বক্তব্য পরবর্তীতে বিপ্লবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিলে পরিণত হয়।
দুই বছর কারাভোগের পর সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তি পান ফিদেল কাস্ত্রো। এরপর তিনি মেক্সিকোতে গিয়ে নতুন করে বিপ্লবের পরিকল্পনা করেন। সেখানে তার সঙ্গে যোগ দেন আর্জেন্টাইন বিপ্লবী আর্নেস্তো ‘চে’ গেভারা। ১৯৫৬ সালে ‘গ্রানমা’ নামের নৌযানে করে তারা কিউবায় ফিরে এসে সিয়েরা মায়েস্ত্রা পর্বতমালায় গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেন।
দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে গেরিলা যুদ্ধের পর ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি বাতিস্তা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এর মাধ্যমে কিউবার বিপ্লব বিজয় অর্জন করে এবং ফিদেল কাস্ত্রো দেশের নতুন নেতৃত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। পরে তিনি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন এবং কিউবা স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়।
মনকাদা ব্যারাকের ব্যর্থ হামলাকেই কিউবার বিপ্লবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে ধরা হয়। এই ঘটনার স্মরণে ফিদেল কাস্ত্রোর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সংগঠনের নাম রাখা হয় ‘২৬ জুলাই আন্দোলন’। আন্দোলনটি শুধু কিউবার রাজনীতিই বদলে দেয়নি, বরং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বিপ্লবী আন্দোলনের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
কিউবার বিপ্লব আজও বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। কেউ এটিকে সামাজিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম হিসেবে দেখেন, আবার কেউ দীর্ঘমেয়াদি একদলীয় শাসন ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতার সমালোচনা করেন। তবে এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও ইতিহাসে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই শুরু হওয়া এই আন্দোলনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।





