জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ ওকিনাওয়ায় আঘাত হেনেছে প্রলয়ংকরী টাইফুন ‘ডলফিন’। এর প্রভাবে পাঁচজন আহত হয়েছেন। এছাড়াও ১৪ হাজার ভবনে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এদিকে ঘূর্ণিঝড়টি পূর্ব চীন ও তাইওয়ানের উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে।
সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কায় পূর্ব চীনের বন্দরগুলো বন্ধ এবং ফেরি চলাচল স্থগিত এবং তাইওয়ানে বিমান চলাচল বাতিল করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওকিনাওয়ায় পাঁচজন বয়স্ক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন তীব্র বাতাসের কারণে পড়ে গিয়ে আঘাত পান, তবে তাদের কারও আঘাতই প্রাণঘাতী নয়। এছাড়া কাগোশিমা প্রিফেকচারে আরও একজন আহত হয়েছেন।
হংকংয়ের ‘চাইনিজ হোয়াইট ডলফিন’-এর নামানুসারে এই ঝড়টির নামকরণ করা হয়েছে। পূর্ব এশিয়ায় যখন রেকর্ড-ভাঙা দাবদাহ চলছে, ঠিক তখনই এই ঝড়টি আঘাত হানল। জাপানের একটি চিড়িয়াখানায় অতিরিক্ত গরমের কারণে তিনটি সিংহের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় তীব্র তাপমাত্রার কারণে ২০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
গত ২৬ জুলাই সৃষ্ট একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় নিম্নচাপ থেকে ডলফিনের উৎপত্তি। প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে কয়েক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার সময় এটি মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের উন্মুক্ত জলরাশির ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৪৫ কিলোমিটার গতিতে অগ্রসর হতে থাকে। যাত্রাপথে এটি প্রথমে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় এবং পরে তীব্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়ে পরিণত হয়। এরপর ২৮ জুলাই এটি পূর্ণাঙ্গ টাইফুন এবং পরবর্তীতে অত্যন্ত শক্তিশালী টাইফুনে রূপ নেয়।
জাপান আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শনিবার(৮ আগস্ট) স্থানীয় সময় ভোর ৩টার দিকে ডলফিন ওকিনাওয়ার কুমে দ্বীপের প্রায় ১৬০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থান করছিল এবং ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার গতিতে উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এ সময় ঝড়টির কেন্দ্রে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৬২ কিলোমিটার এবং দমকা হাওয়ার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২১৬ কিলোমিটার।
ঝড়টি চীনের পূর্ব উপকূলের দিকে এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় কর্তৃপক্ষ তিন-স্তরের জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছে, যা সতর্কতার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্তর। চীনের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্যমতে, টাইফুন ‘ডলফিন’-এর প্রভাবে রবিবার গভীর রাত থেকে সোমবার ভোরের মধ্যে চীনের পূর্ব ও দক্ষিণ উপকূলে ঝড়টি আঘাত হানতে পারে। এটি মূলত ঝেজিয়াং প্রদেশের ঝৌশান শহর এবং ফুজিয়ান প্রদেশের ফুডিং শহরের মধ্যবর্তী কোনো এলাকায় আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে।
১২ আগস্ট পর্যন্ত সাংহাই ও এর পার্শ্ববর্তী প্রদেশসহ পূর্ব চীনের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি ও প্রবল বাতাস বয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, পূর্ব ঝেজিয়াংয়ের কিছু এলাকায় ৬০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে।
ঝেজিয়াং কর্তৃপক্ষ উপকূলীয় এলাকায় টাইফুন সতর্কতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করেছে, বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং ১৬২টি যাত্রীবাহী ফেরি রুটে চলাচল স্থগিত করেছে। প্রদেশটির অন্যতম বড় শহর নিংবোর কর্তৃপক্ষ এই সপ্তাহে স্কুল, অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং জলপথ-সংক্রান্ত সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
ঝেজিয়াংয়ের নিংবো লিশে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও জানিয়েছে, তারা শনিবার রাত সাড়ে ১১ টা থেকে কার্যক্রম বন্ধ রাখবে এবং রবিবার সব ফ্লাইট স্থগিত করবে। সাংহাইয়ের ইয়াংশান বন্দর থেকে সব জাহাজ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ইয়াংজি নদী বদ্বীপ অঞ্চলের কিছু ট্রেন পরিষেবা রবিবার থেকে স্থগিত করা হবে।
এদিকে টাইফুনের কারণে তাইওয়ানও ৬৩টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করেছে বলে সরকার জানিয়েছে। এ সপ্তাহে দ্বীপটির উত্তরাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস থাকলেও, শনিবার পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ কোনো এলাকা খালি করার নির্দেশ দেয়নি। চীন নির্দেশ দিয়েছে, টাইফুনের কারণে তাইওয়ান প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে অবশ্যই তাদের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ নির্দেশিকা মেনে চলতে হবে। তাইপেই এই পদক্ষেপকে ‘হাস্যকর’ বলে অভিহিত করেছে। তারা আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের কোনো অধিকার বেইজিংয়ের নেই বলে দাবি করেছে।
চীন গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে মনে করে এবং কৌশলগত এই প্রণালীর ওপর নিজেদের মালিকানা দাবি করে। তবে তাইপেই সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
সূত্র: রয়টার্স, আলজাজিরা।





