‘ব্রহ্মপুত্রের’ মাছের গতিবিধি নজরদারিতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে চীন

তিব্বতের বৃহত্তম নদী ইয়ারলুং সাংপোতে মাছের চলাচল পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করছে চীন। বাঁধের ওপর নির্মিত মাছ চলাচলের পথ বা ‘ফিশওয়ে’ দিয়ে কোন প্রজাতির কত মাছ যাচ্ছে, তা এখন দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত ও গণনা করছে এআই।

মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে, আগে এই কাজ করতে শ্রমনির্ভর ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে মাছ গণনা করা হতো। বর্তমানে ‘ফিশ ফেসিয়াল রিকগনিশন’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিব্বত অঞ্চলের নিজস্ব প্রজাতির মাছ শনাক্ত করা হচ্ছে।

ইয়ারলুং সাংপো নদীর মধ্যাঞ্চলে ২০১৫ সালে ১১৬ মিটার (৩৮১ ফুট) উচ্চতার জাংমু জলবিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়। এরপর থেকে কেন্দ্রটির ফিশওয়ে ব্যবহার করে প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার বিরল মাছ উজানে যেতে পেরেছে।

জাংমু জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষা বিভাগের পরিচালক ইয়াং শিয়াওচেং গ্লোবাল টাইমসকে বলেন, পর্যবেক্ষণের ফল অনুযায়ী ইয়ারলুং সাংপোর মধ্যাঞ্চলে মাছের সংখ্যা বেশ স্থিতিশীল রয়েছে। জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কারণে মাছের সংখ্যা কমেনি। বরং নদীর মধ্য গিরিখাতজুড়ে জলজ পরিবেশ এবং প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে।

জলবিদ্যুৎকেন্দ্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নির্ভরযোগ্য নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহে পরিবর্তন আনার কারণে পরিবেশের ওপর এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে বাঁধ মাছের স্বাভাবিক চলাচলের পথ আটকে দিতে পারে। এতে খাবার সংগ্রহ ও প্রজননস্থলে যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হয়ে মাছের বংশবিস্তার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাঁধের কারণে মাছের অভিবাসনপথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে এ ধরনের ক্ষতি কমাতে ফিশওয়ে বা মাছ চলাচলের কৃত্রিম পথ তৈরি করা যায়। সাধারণত এসব পথে ছোট ছোট ধাপ বা পানির পুল তৈরি করা হয়, যাতে পানির স্রোতের গতি কমে এবং মাছ ধীরে ধীরে বাঁধ অতিক্রম করে উজানে যেতে পারে।

জাংমু জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ফিশওয়ে তৈরির আগে প্রকল্পের কর্মকর্তারা কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রকল্প পরিদর্শন করে অভিজ্ঞতা নেন। স্থানীয় ঠান্ডা পানির মাছের সাঁতারের সক্ষমতা তুলনামূলক কম হওয়ায় ফিশওয়েটি কম ঢালু করে তৈরি করা হয়েছে। মাছকে উজানে যেতে উৎসাহিত করতে পানির প্রবাহের গতিও নির্দিষ্ট মাত্রায় রাখা হয়েছে।

এই ফিশওয়ে দিয়ে নদীটির নিজস্ব সাতটি মাছের প্রজাতি চলাচল করে। এর মধ্যে উচ্চভূমিতে পাওয়া সংরক্ষিত প্রজাতি গ্লিপ্টোস্টার্নন ম্যাকুলেটাম-ও রয়েছে।

ফিশওয়েটি নির্মাণের পর শুরুতে পর্যবেক্ষণ কক্ষের জানালা দিয়ে কর্মীরা মাছ দেখে হাতে হাতে গণনা করতেন। কিন্তু মাছের সংখ্যা বাড়তে থাকায় এই পদ্ধতি ধীরগতির হয়ে পড়ে এবং সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।

পরে অতীতের ভিডিও ফুটেজ দিয়ে প্রশিক্ষিত এআইভিত্তিক মাছ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করা হয়। সোনার ও অপটিক্যাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি এই ব্যবস্থা মাছের প্রজাতি শনাক্ত, সংখ্যা গণনা এবং সাঁতারের ভঙ্গি ও পাখনার বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করতে পারে। এর নির্ভুলতা প্রায় ৯৫ শতাংশ বলে জানানো হয়েছে।

এআই ব্যবস্থা মাছের চলাচলের সময় এবং পানির তাপমাত্রার তথ্যও সংগ্রহ করে। এসব তথ্য ব্যবহার করে ফিশওয়ের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও চীনের অন্যান্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে তথ্য ভাগ করে নেওয়া হচ্ছে।

এ ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রেও ব্যবহার করা হচ্ছে। আলাস্কা ফিশারিজ সায়েন্স সেন্টার ড্রোন, এআই ও থ্রিডি স্টেরিও ক্যামেরার মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন মাছের প্রজাতি পর্যবেক্ষণ করছে। কানাডার নোভা স্কশিয়াতেও জলবিদ্যুৎ বাঁধ দিয়ে যাওয়া মাছ শনাক্ত, শ্রেণিবিন্যাস ও গণনার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে।

ইয়ারলুং সাংপো নদীতে বিরল মাছের সংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে জাংমু কেন্দ্রের উদ্যোগে মাছ প্রজনন ও অবমুক্তকরণ কর্মসূচিও চলছে। গ্লোবাল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রটি চালুর পর থেকে প্রায় ২০ লাখ মাছ নদীতে অবমুক্ত করা হয়েছে।

এদিকে ইয়ারলুং সাংপো নদীর নিম্নাঞ্চলে চীন বর্তমানে ৬০ গিগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিশাল জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণ করছে। তিব্বতের মেডগ কাউন্টির কাছে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের সক্ষমতা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থ্রি গর্জেস ড্যামের প্রায় তিন গুণ হবে।

তবে নতুন এই প্রকল্পটি নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে নদীর নিম্নপ্রবাহে ভারতের অরুণাচলসহ বিভিন্ন অঞ্চল এবং বাংলাদেশে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ভারতে ইয়ারলুং সাংপো নদীটি ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত।

সূত্র: সাউথ চায়না মনিং পোস্ট