গবেষণাগারে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা ক্ষুদ্র মানব মস্তিষ্ক (মিনিব্রেইন) নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে। বিজ্ঞানীদের নতুন পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পাত্রে লালন করা এই অনু-মস্তিস্কগুলো বাস্তব মস্তিষ্কের মতো স্বাভাবিক বা নির্ধারিত সময়সূচি অনুসরণ করে বিকশিত হতে পারছে না। মস্তিষ্কের গঠন প্রক্রিয়া এবং স্নায়ুসংক্রান্ত নানা জটিল রোগ বোঝার ক্ষেত্রে গবেষকদের বহুল ব্যবহৃত এই মডেলে সময়ের এমন অসামঞ্জস্যতা ভবিষ্যতে স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, একটি স্বাভাবিক মস্তিষ্কের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটে সুনির্দিষ্ট কিছু ধাপ অতিক্রম করে। এই প্রক্রিয়ায় কোন কোষটি কখন এবং কার আগে তৈরি হবে, তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্ধারিত থাকে। সময়মতো কোষের জন্ম না হলে পরবর্তীতে তাদের মধ্যে সঠিক স্নায়ুবিক সংযোগ তৈরি হওয়া সম্ভব হয় না। তবে অস্ট্রিয়ার ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির স্নায়ুবিজ্ঞানী সাইমন হিপেনমেয়ার এবং তার দল ইঁদুরের ওপর চালানো গবেষণায় দেখেছেন, ল্যাবে তৈরি অর্গানয়েড বা মিনিব্রেইনগুলো হুবহু আসল মস্তিষ্কের মতো প্রধান প্রধান সব কোষ তৈরি করতে পারলেও সেগুলোর বিকাশের ধারাবাহিকতা বা সময়ের অনুক্রম ধরে রাখতে পারছে না।
স্বাভাবিক মস্তিষ্কের বহিরাবরণ (সেফালিক কর্টেক্স) গঠনের সময় মূল স্টেম সেলগুলো প্রথমে বংশবৃদ্ধি করে এবং পরবর্তীতে নির্দিষ্ট ধরনের স্নায়ুকোষে রূপান্তরিত হয়। তবে মিনিব্রেইনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কিছু স্টেম সেল পর্যাপ্ত পরিপক্কতার আগেই অকালে স্নায়ুকোষে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। এর ফলে মস্তিষ্কের ছয়টি স্তরের গঠন বাধাগ্রস্ত হয়। আসল মস্তিষ্কে একটি নির্দিষ্ট স্টেম সেল পর্যায়ক্রমে ভেতরের ও বাইরের স্তরের স্নায়ুকোষ তৈরি করতে পারলেও মিনিব্রেইনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ স্টেম সেল তাদের বহুমুখী সম্ভাবনা হারিয়ে কেবল এক ধরনের কোষে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
অস্ট্রিয়ার গবেষকরা মনে করছেন, কৃত্রিম এই কাঠামোতে রক্তনালী, বহুকোষীয় উদ্দীপনা এবং প্রয়োজনীয় বিপাকীয় সংকেতের অনুপস্থিতিই সময়ের এই অমিলের মূল কারণ। একটি জীবিত দেহে কোষগুলো আশেপাশের পরিবেশ থেকে যেসব শারীরিক ও রাসায়নিক ইঙ্গিত পায়, তা মিনিব্রেইনের ল্যাব-পরিবেশে থাকে না। জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী ডেনিস জাবাউদোঁ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে জানান যে, স্নায়ুকোষগুলোর একে অপরের সঙ্গে সঠিক সংযোগ স্থাপনের জন্য সময় এবং অবস্থানের সমন্বয় অপরিহার্য। সময়সূচীতে এই হেরফেরের ফলে মস্তিষ্কের নিজস্ব যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরিতে বিঘ্ন ঘটে, যা ভবিষ্যতে ম্যাক্রোসেফালি বা মাইক্রোসেফালির মতো অস্বাভাবিক মস্তিষ্কের আকার সংক্রান্ত জটিল রোগের সঠিক কারণ অনুসন্ধানে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
বর্তমানে গবেষক দলটি মানুষের কোষ থেকে প্রাপ্ত অর্গানয়েডের ওপর এই গবেষণা বিস্তারের পরিকল্পনা করছেন। তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো, জীবিত মস্তিষ্কের পরিবেশ থেকে প্রাপ্ত যেসব সংকেত মিনিব্রেইনে অনুপস্থিত, সেগুলোকে শনাক্ত করে কৃত্রিম উপায়ে যোগ করা। যদি এসব ঘাটতি পূরণ করে বাস্তব মস্তিষ্কের মতো সঠিক সময়সূচি মিনিব্রেইনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়, তবে ভবিষ্যতে ভ্রূণের জটিল রোগব্যাধি দূর করার গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স





